২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শেষের পাতা

ভুল রায়ে ৪০ বছর কারাগারে; জেল থেকে বেরোতেই আবার আইসিইর হাতে আটক ভারতীয় বংশোদ্ভূত বৃদ্ধ

ভুল রায়ে ৪০ বছর কারাগারে; জেল থেকে বেরোতেই আবার আইসিইর হাতে আটক ভারতীয় বংশোদ্ভূত বৃদ্ধ

যে খুনের অপরাধ তিনি করেননি, সেই দায়ে জীবনের দীর্ঘ চার দশক কেটেছে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। গত বছরের অক্টোবরে যখন পেনসিলভানিয়ার কারাগার থেকে নির্দোষ হিসেবে মুক্তির প্রহর গুনছিলেন ৬৪ বছর বয়সী সুব্রামানিয়াম ‘সুবু’ ভেদাম, ঠিক তখনই ঘটল এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। কারাগারের ফটক দিয়ে মুক্ত মানুষ হিসেবে বেরিয়ে আসার পরিবর্তে তাঁকে আবারও আটক করে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন এনফোর্সমেন্ট কর্তৃপক্ষ (আইসিই)।

সুবু ভেদাম যখন শিশু ছিলেন, তখন ভারত থেকে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। দীর্ঘ ৪০ বছর পর তাঁর বিরুদ্ধে আনা খুনের অভিযোগ আদালত থেকে খারিজ হয়ে যায়। কিন্তু তাঁর আইনজীবীর তথ্যমতে, কয়েক দশক পুরোনো একটি ‘ডিপোর্টেশন’ আদেশের অজুহাতে তাঁকে আবারও বন্দি করা হয়।

গত মঙ্গলবার (১৮ ফেব্রুয়ারী) সকালে এক ফেডারেল অভিবাসন বিচারক সুবুর জামিনের আবেদন নাকচ করে দিয়েছেন। সুবুর আইনজীবী আভা বেনাখ জানিয়েছেন, তাঁরা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন। সুবুর এই দীর্ঘ কারাবাসের নেপথ্যে ছিল এক বড় অবিচার। গত আগস্টে আদালত দেখতে পান, কয়েক দশক আগে সুবুর যখন বিচার চলছিল, তখন কৌঁসুলিরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রমাণ গোপন করেছিলেন। সেই প্রমাণের ভিত্তিতেই আদালত তাঁর সাজা বাতিল করেন এবং তাঁকে নির্দোষ ঘোষণা করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘বোর্ড অব ইমিগ্রেশন অ্যাপিলস’ সুবুর অভিবাসন মামলাটি পুনরায় পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু সুবুর মুক্তি ঠেকাতে অনড় যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস)। ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া অবস্থানের কথা উল্লেখ করে ডিএইচএস-এর একজন মুখপাত্র বলেন, ‘একটি সাজা বাতিল হলেই কেউ ছাড় পাবেন না। আপনি যদি আইন ভাঙেন, তবে আপনাকে তার পরিণতি ভোগ করতেই হবে।’ ডিএইচএস সুবুকে ‘অপরাধী অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করলেও তাঁর আইনজীবী জানিয়েছেন, তিনি একজন বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা।

১৯৮০-এর দশকের দিকের কথা। বন্ধু ও রুমমেট টমাস কিনসারকে খুনের দায়ে সুবু ভেদামের সাজা হয়েছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। প্রায় ৪০ বছর তিনি কারাগারের চার দেয়ালের মাঝে বন্দি ছিলেন। কিন্তু সুবু বরাবরই দাবি করে আসছিলেন, তিনি এই খুন করেননি। অবশেষে চার দশক পর জানা গেল, সুবু নির্দোষ ছিলেন। কিন্তু বিড়ম্বনা যেন তাঁর পিছু ছাড়ছে না। ১৯৮০ সালের ডিসেম্বরে নিখোঁজ হন ১৯ বছর বয়সী কলেজছাত্র টমাস কিনসার। নিখোঁজ হওয়ার দিন তিনি সুবুকে নিয়ে পাশের একটি শহরে যাচ্ছিলেন। এর ৯ মাস পর কিনসারের দেহাবশেষ পাওয়া যায়। তাঁর মাথায় গুলির চিহ্ন ছিল। পুলিশ কোনো অস্ত্র উদ্ধার করতে না পারলেও কিনসারের লাশের কাছে একটি ‘.২৫ ক্যালিবার’-এর গুলি পায়।

তদন্তকারীরা শুরু থেকেই সুবুকে একমাত্র সন্দেহভাজন হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। সুবুর সমর্থকদের দাবি, তিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণেই পুলিশ তাঁকে ফাঁসানোর সহজ লক্ষ্য বানিয়েছিল। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেছিলেন, সুবু আগে কেনা একটি .২৫ ক্যালিবারের বন্দুক দিয়ে তাঁর বন্ধুকে গুলি করেছেন।
কিন্তু চার দশক পর সুবুর আইনজীবীরা এক চাঞ্চল্যকর তথ্য খুঁজে পান। এফবিআই-এর একটি পুরোনো রিপোর্টে দেখা যায়, কিনসারের মাথায় গুলির যে ক্ষত ছিল, তা .২৫ ক্যালিবার বন্দুকের গুলির তুলনায় অনেক ছোট। অর্থাৎ ওই বন্দুক দিয়ে এই খুন করা সম্ভব ছিল না। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি জেনেশুনে গোপন করেছিলেন এবং সুবুর আইনজীবীদের কাছে সেই রিপোর্ট পৌঁছাতে দেননি।

এই প্রমাণ সামনে আসার পর ২০২৫ সালের আগস্টে একজন বিচারক রায় দেন যে, সুবু ন্যায্য বিচার পাননি। তাঁর সাজা বাতিল করা হয় এবং নতুন করে বিচারের আদেশ দেওয়া হয়। গত ২ অক্টোবর সংশ্লিষ্ট জেলা অ্যাটর্নির কার্যালয় ঘোষণা করে যে, তারা আর নতুন করে মামলা চালাবে না এবং সুবুর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী ৩ অক্টোবর সুবুর মুক্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জেল থেকে বেরোনোর মুহূর্তেই তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নেয় যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ (আইসিই)।

সুবুর বোন সরস্বতী ভেদাম বার্তা সংস্থা এপি-কে বলেন, তাঁর ভাইয়ের এই নতুন বন্দিদশা তাঁদের ব্যথিত করেছে। তিনি বলেন, ‘সুবু জানে পৃথিবীটা সবসময় যুক্তিতে চলে না। আমাদের ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি—সত্য, ন্যায় আর দয়ারই জয় হবে।’

দীর্ঘ ৪০ বছরের লড়াই শেষে যখন সুবুর ঘরে ফেরার কথা ছিল, তখন এক আইনি মারপ্যাঁচ থেকে বেরিয়ে তিনি জড়িয়ে পড়লেন আরেক আইনি লড়াইয়ে।