নভেম্বরের এক সকাল। দুই দিন পর জোহানেসবার্গে বসবে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশগুলোর জোট জি-২০ এর সম্মেলন। তার ঠিক ২০ মিনিট দূরে প্রিটোরিয়ায় দক্ষিণ আফ্রিকা ও চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানরা এক বৈঠকে বসলেন। উদ্দেশ্য, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্য কমানোর পথে এক ধাপ এগোনো।
দক্ষিণ আফ্রিকার রিজার্ভ ব্যাংকের ওই অনুষ্ঠানে দেশটির বৃহত্তম ব্যাংক ‘স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক’ চীনের ‘ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম’ (সিআইপিএস)-এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হলো। আফ্রিকার প্রথম ব্যাংক হিসেবে এই কৃতিত্ব তাদের। এর অর্থ হলো, এখন থেকে আফ্রিকার ব্যবসায়ীরা কোনো মধ্যস্থতাকারী মুদ্রা (বিশেষ করে মার্কিন ডলার) ছাড়াই সরাসরি ইউয়ানে চীনের সঙ্গে লেনদেন করতে পারবেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মার্কিন ডলার বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ কারেন্সি। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৮০ শতাংশেরও বেশি ডলারে হয়।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডলারের বিকল্প খোঁজার আওয়াজ জোরালো হয়েছে, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোতে। এর নেতৃত্বে আছে ব্রিকস জোট। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে সম্প্রতি যোগ দিয়েছে মিসর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
ব্রাজিলও সিআইপিএসে যুক্ত হয়েছে। চীনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে (যেমন সয়াবিন বিক্রি) তারা ডলারের বদলে রিয়াল এবং ইউয়ান ব্যবহার বাড়াচ্ছে। ভারত ও আমিরাত রুপি ও দিরহামে বাণিজ্য করেছে। চীন ও আমিরাত এলএনজি বাণিজ্যে ইউয়ান ব্যবহার করেছে। আর্জেন্টিনা, ইরাক ও সৌদি আরবের সঙ্গেও চীন ইউয়ানে লেনদেন করেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে চীন ও রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে নিজস্ব মুদ্রার ব্যবহার বাড়িয়েছে। ভারত ও রাশিয়াও রুপি-রুবলে বাণিজ্য করছে।
ব্রিকস তাদের নিজস্ব ডিজিটাল মুদ্রা ‘ব্রিজ’ নিয়ে কাজ করছে। এটি সফল হলে ডলার এবং সুইফট সিস্টেম ছাড়াই বাণিজ্য করা সম্ভব হবে। সুইফট মূলত মার্কিন ও ইউরোপীয় প্রভাবে চলে। এই বছরের ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে ব্রিজ সিস্টেমের একটি মডেল উপস্থাপন করা হতে পারে।
ডলারের ‘লুকানো খরচ’ : গত এক দশকে বিশ্ব বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমেছে, আর চীনের বেড়েছে। বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথে, যেখানে বিশ্বের ৮৫ শতাংশ মানুষ বাস করে।
দক্ষিণ আফ্রিকার থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল ডায়ালগ’-এর বিশ্লেষক সানুশা নাইডু বলেন, ‘ডলারে লেনদেন করলেই একটা গোপন খরচ বা হিডেন কস্ট যুক্তরাষ্ট্রের পকেটে যায়। এখন দেশগুলো প্রশ্ন তুলছে—কেন আমরা আমেরিকাকে এই টাকা দেব?’ নিজস্ব মুদ্রায় সরাসরি লেনদেন হলে এই খরচ বাঁচে এবং মুদ্রা বিনিময়ের ঝুঁকি কমে।
তবে ইউনিভার্সিটি অফ প্রিটোরিয়ার অধ্যাপক ড্যানি ব্র্যাডলো বলেন, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যে ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জ আছে। যেমন বতসোয়ানা ও মেক্সিকোর মধ্যে বাণিজ্য কম। তাই একে অপরের মুদ্রা জমিয়ে রাখার চেয়ে ডলার ব্যবহার করাই তাদের জন্য সুবিধাজনক।
লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সের শার্লি ইউ বলেন, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের জন্য সিআইপিএস, ব্রিকস পে এবং এম-ব্রিজের মতো অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করতে হবে। যদিও স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ছে, তবুও সুইফট ও ডলারের তুলনায় তা নগণ্য। চীনা মুদ্রা ইউয়ান এখনো বিশ্ববাণিজ্যের ১০ শতাংশেরও কম দখলে রেখেছে।
পরিবর্তনের হাওয়া : ব্র্যাডলো বলেন, ডলারের বিকল্প খোঁজার আগ্রহ নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। সোনার দাম বাড়াই এর প্রমাণ। দেশগুলো ডলারকে আর পুরোপুরি স্থিতিশীল মনে করছে না। তাই তারা সোনা ও রুপায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে ঝুঁকি কমাচ্ছে।
ম্যাক্রো-এডভাইজরির বিশ্লেষক ক্রিস উইফার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবর্তন এই অবিশ্বাসের কারণ। ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনিশ্চিত আচরণ এবং ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল ঋণের কারণে ডলার আগের মতো নিরাপদ মনে হচ্ছে না।’
ব্র্যাডলো বলেন, ট্রাম্প ছাড়াও ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বিশ্বের জন্য সমস্যা। যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতির কারণে অন্য দেশগুলো বিপদে পড়ে। তাই বহুমুখী ব্যবস্থা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। ডলারের কি পতন হবে?
বেশির ভাগ বিশ্লেষক বলছেন, এখনই না। উইফার বলেন, ‘তেল বা কাঁচামালের দাম নির্ধারণে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ হিসেবে ডলারই প্রধান থাকবে। বর্তমানে ডলারের কোনো বিকল্প নেই।’
গ্লোবাল সাউথ ও ব্রিকস দেশগুলো আসলে ডলারের পুরোপুরি বিকল্প চাইছে না। তারা চাইছে বৈচিত্র্য এবং লেনদেনের বিকল্প ব্যবস্থা, যাতে সুইফটের ওপর নির্ভর করতে না হয়। শার্লি ইউ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ডলারের আধিপত্য ধরে রাখতে সব কিছু করবে। ট্রাম্প ‘জিনিয়াস অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে ডলারের অবস্থান শক্ত করতে চান। ডলার যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় শক্তির ভিত্তি।
‘ধীরে জ্বলে যাওয়া’ পতন : সানুশা নাইডু মনে করেন, ডলার এখন এক ‘আহত পরাশক্তি’। যখন কোনো আধিপত্যবাদী শক্তি আহত হয় এবং চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, তখন তা বিপজ্জনক ও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার চার স্তম্ভ—নিরাপত্তা, অর্থ, জ্ঞান ও উৎপাদন—সবই ডলারের ওপর দাঁড়িয়ে। বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি হলে এই স্তম্ভগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। ডলার হঠাৎ ধসে না পড়লেও এটি ধীরে ধীরে পতনের দিকে যাচ্ছে, যা দ্রুত পতনের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হতে পারে।
উইফার বলেন, মানুষ যদি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারায়, তবে শেষ পর্যন্ত চীনা ইউয়ানের উত্থানই ডলারের আধিপত্য ভাঙবে। বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথে। শার্লি ইউ বলেন, ‘পেট্রোডলারের’ বদলে যেদিন ‘পেট্রোইউয়ান’ বিশ্ববাজারে তেলের দাম নির্ধারণে ব্যবহৃত হবে, সেদিনই ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটবে। ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে চীনের তেল বাণিজ্যে ইতিমধ্যেই ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ছে।
তবে বিশ্লেষকদের শেষ কথা হলো—ডলারের জন্য এখনই বা মধ্যমেয়াদে কোনো বড় হুমকি নেই। এর কারণ ডলারের শক্তি নয়, বরং বিশ্ববাণিজ্যে এখনো এর কার্যকর কোনো বিকল্প না থাকা।- সুমায়া ইসমাইল; আল জাজিরা