


মানুষের মধ্যে সম্পর্ক বলতে আগে যেটি ছিল মুখোমুখি আলাপ, চিঠি, বা অন্তত দীর্ঘ কথোপকথন, এখন তা গুটিয়ে গিয়ে আটকে আছে ছোট ছোট নোটিফিকেশন আর স্ক্রলিংয়ের ভেতরে। আবেগ-অনুভূতির লেনদেন, আলাপ-সালাপ তেমন একটা আর নেই বললেই চলে। সবকিছুই এখন ”কনটেন্ট’ মাত্র এবং অদ্ভুতভাবে আমাদের সম্পর্কগুলোও যেন তাই!
অনেকেই বলেন, এখনকার দিনে সম্পর্ক রক্ষার সবচেয়ে বড় বন্ধু যেমন স্মার্টফোন, ঠিক একইভাবে ভাঙনের নীরব কারিগরও এই একই যন্ত্র।
কথাটা ঠিক কতখানি যৌক্তিক—সে প্রশ্নে আজ না-ই বা গেলাম। তবে সত্য হলো, আমাদের জীবনের বড় একটি অংশ এখন বাস করছে ফোনের ভেতর। সেখানে গড়ে উঠেছে আমাদের নিজস্ব এক জগৎ, যার সঙ্গে বাস্তব দুনিয়ার মিল খুব বেশি নেই। কারণ এখানে মুখোমুখি বসে কিছু করার সুযোগ নেই।
গেমস, ভিডিও, রিলস, খবর, গান, অনলাইন শপিং, নানা অ্যাপ—ফোনে এত কিছুর ভিড়ে আমাদের পরস্পরের মধ্যকার বন্ধনও যেন আরেকটি ‘কনটেন্ট’ হয়ে দাঁড়ায়। অবশ্য এর পেছনে কারণের অভাব নেই। সবকিছুই এমনভাবে সাজানো ও গুছিয়ে দেওয়া যে একটু ঢুঁ মারলেই চোখে পড়ে মজার ভিডিও, রিলস, বিজ্ঞাপন, নাটক, সিনেমা—আরও কত কী। ফলে কাছের মানুষের সান্নিধ্য আর ‘কনটেন্ট’-এর বিনোদনের মধ্যে স্পষ্ট কোনো পার্থক্য আর থাকে না।
এছাড়া প্রিয়জনের সঙ্গে আলাপচারিতার চেয়েও অনেক সময় বেশি আকর্ষণীয় মনে হয় অচেনা কারও ভিডিও, কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপন কিংবা নতুন কোনো বন্ধুর অযাচিত পরামর্শ। সব মিলিয়ে আমাদের চারপাশে তৈরি হয় এক অদ্ভুত রঙচঙে দুনিয়া—যেখানে নেই দায়িত্বের ভার, নেই অন্য কোনো চাপ।
মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে ব্যবহারকারীর মনোযোগ দীর্ঘ সময় ধরে নির্দিষ্ট কোনো কনটেন্টের ওপর আটকে থাকে। সেই টান এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে একসময় এই ভার্চুয়াল জগত থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে।
ফেসবুকের কথাই ধরা যাক। এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম কীভাবে আমাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে—সে বিষয়ে কথা হয় মুশফিকুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, সোশ্যাল মিডিয়া স্পেশালিস্ট ও সাইবার সিকিউরিটি অ্যানালিস্ট। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ব্যাচেলর শেষ করার পর থেকেই তিনি নিয়মিত সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে কাজ করছেন। তার নিজস্ব আইটি ফার্মে ইতোমধ্যে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীকে সাইবার সিকিউরিটির প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। ক্রিকেটার, ফুটবলার ও মিডিয়ার পরিচিত মুখসহ অনেকের সাইবার নিরাপত্তা বিষয়েও তিনি কাজ করেছেন।
তিনি বলেন, “ফেসবুক খুব সহজেই বুঝতে পারে কোন ধরনের কনটেন্ট আমরা বেশি দেখি। ওরা সময় মাপে। যেটিতে বেশি সময় দিই, সেটিই আবার সাজেস্ট করে। আর যেগুলো আমরা স্কিপ করি, সেগুলো আমাদের সামনে দেখানো কমে যায়। “মূলত কোনো ভিডিও আসার পর সাধারণত ২–৩ সেকেন্ডের মধ্যেই গ্রাহক ঠিক করে সেটা দেখবে কি না। এই ছোট সময়টুকুই অ্যালগরিদমকে বলে দেয় কন্টেন্টটি আবার দেখানো উচিত কি-না।
মুশফিকুর জানান, ব্যবহারকারীর বয়স অনুমান করার ক্ষেত্রেও ফেসবুক বেশ দক্ষ। ব্যবহার আচরণ, কনটেন্ট দেখা, আর অ্যাকাউন্ট খোলার সময় দেওয়া জন্মতারিখ সবকিছু মিলিয়েই বয়স অনুযায়ী সাজেশন্সও তৈরি করে দেয় এই যোগাযোগমাধ্যম৷ “আমরা যখন কোনো বিষয় সার্চ করি, তখন সেই বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত সবকিছু আমাদের সামনে এসে ভেসে ওঠে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা ক্রিয়েটরদের বুস্ট করা পেইজের কন্টেন্টগুলো খুব সহজেই আমাদের স্ক্রিনে চলে আসে। আর আমরা এতে আসক্ত হয়ে পড়ি এবং ফেসবুকে সময় কাটানোকে গুরুত্ব দিই,” বলেন মুশফিক।
একই কথা শোনা গেলো ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ড. ইসমত জাহানের মুখেও। তিনি বলেন, “আমরা এমন এক সময়ের মধ্যে বাস করছি, যখন মানুষ মুখোমুখি কথা বলার চেয়ে ফেসবুকে ‘কানেক্টেড’ থাকাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। কিন্তু আসলে এই সংযোগে সত্যিকারের যোগাযোগ নেই। প্রতিযোগিতামূলক জীবনে মানুষ এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছে যে খারাপ লাগা, ভালো লাগার মতো সাধারণ অনুভূতিগুলোও আর কাউকে বলতে চান না। তাই অনেকে ইচ্ছে করেই সরাসরি যোগাযোগ এড়িয়ে চলেন। এটাই এখনকার সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা।”
তার ভাষায়, “মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাডিকটেড হয়ে গেছে। সাথে তৈরি হয়েছে ডিপেনডেন্সি বা নির্ভরশীলতা। গেমস, রিলস, শপিং—অসীম অপশন হাতের নাগালে। কিন্তু আসলে সেগুলোর কোনো প্রোডাক্টিভিটি নেই।” আমাদের যে যোগাযোগের জন্য ‘কথা বলার’ প্রয়োজন ছিল, সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই প্রয়োজনটুকুও নেই। নিস্ক্রিয়তার এই আরাম মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখছে। যে কাউকে নিজেদের রিফ্রেশমেন্টের উপায় জিজ্ঞেস করলেই উত্তর আসে, ‘ফেসবুক স্ক্রল করি’। ফলাফল? শুধুই সময় পার, আর কিছুই নয়।
এই যে এড়িয়ে চলার অভ্যাস বা দায়িত্ব নিতে না চাওয়ার যে ব্যাপার তা মানুষকে তার পরিবার থেকেও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। ধরা যাক, বাসায় কোনো গেটটুগেদার হচ্ছে। দেখা যায়, সবার চোখ থাকে ফোনে। মাঝে মাঝে দু’একটা কথার আদান–প্রদান ছাড়া বেশি কিছু চোখে পড়ে না।
ড. ইসমত বলেন, “বন্ডিংগুলো এখন ফিশি হয়ে গেছে। মানুষ মনে করে, একটা ফেসবুক রিয়্যাক্ট দিলেই দায়িত্ব শেষ। বলা যায়, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।”
ব্যাপারটি ঠিক কতটুকু গভীরে পৌঁছেছে তা বুঝতে কথা বলেছিলাম নিয়মিত ফেসবুক ব্যবহারকারী রাইসা খানমের সাথে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স অধ্যয়নরত এই শিক্ষার্থী জানান, ফেসবুকে ঢুকে প্রায়ই তিনি এক পোস্ট থেকে আরেক পোস্টে, এক ভিডিও থেকে আরেক ভিডিওতে চলে যেতে থাকেন নিজের অজান্তেই। কত ঘণ্টা পেরিয়ে যায়, তার হিসেব থাকে না। বহু চেষ্টার পরেও সাজানো সে দুনিয়া থেকে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বের হতে পারেন না রাইসা।
ভার্সিটি থেকে এসে মাত্রই আব্বু-আম্মুকে ফোন দেব এই চিন্তায় ফোন হাতে নিলেও সেটি আর হয়ে ওঠে না। দেখা যাচ্ছে ঘণ্টা ধরে ফোনের মধ্যে পড়ে আছি, কিন্তু কোনো দরকারি কাজ হয় না। এভাবে করে কোনো কোনো সময় রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে যায়,” বলেন রাইসা।
সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্ত আরেক শিক্ষার্থী ফাহাদ হোসেন বলেন, “আমার ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশ গুরুতর পর্যায়ে চলে গেছে বলতে পারেন। আমি ফোন হাতে একা একা সময় কাটিয়ে দিতে পারি। ভালোও লাগে। এমনকি আমার প্রায় সব যোগাযোগই ফোনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার প্ল্যানটাও আমি স্ক্রিনেই করি। অনেক সময় কাউকে কল করার সময়টাও হয়ে ওঠে না। মেসেঞ্জারে লিখে চ্যাট করার বদলে ভয়েস মেসেজ করে কাজ সেরে ফেলি। মাঝেমধ্যে এমনও করি যে কাছের কেউ মেসেজ দিলে সেটি সিন করে ফেলে রাখি। উত্তর দেব দেব করেও আর দেওয়া হয় না।”
অবশ্য এই ব্যাপারে ড. ইসমত বলেন, “এখনকার সম্পর্ক শুধু একতরফাই নয় বরং ক্যালকুলেটিভও। সবাই নিজের মতো করে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। তবে এর পেছনে আছে দীর্ঘ সময়ের সামাজিক পরিবর্তন।”
“নব্বই দশকের পর থেকে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি (ছোট পরিবার) বেড়েছে, পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু ভেঙে প্রত্যেকে নিজের মতো ‘আলাদা জগতে’ থাকতে শিখেছে। আগে একসাথে বসে টিভি দেখার যে অভ্যাস ছিল, এখন সেখানেও রয়েছে বিভক্তি, একটি টিভি বেডরুমে, আরেকটি ড্রয়িংরুমে। এমনকি রিমোট নিয়ে ঝগড়াও আর নেই, কারণ মানুষের মধ্যে টিভি দেখাও কমে গেছে। মোবাইল-কেন্দ্রিক জীবন সবার, যেখানে অন্যের জগতে ঢুকে পড়তে মুহূর্তও লাগে না; লাগে না কোনো পরিশ্রমও,” যোগ করেন তিনি। এ সবের কারণে মানুষের মধ্যে এড়িয়ে চলার অভ্যাস বেড়েছে। তাই এখন আর ফোন কল করেও কারো খবরাখবর নেওয়া হয় না। ফেসবুক পোস্ট দেখেই মানুষের অবস্থা আন্দাজ করে নেন অনেকে।
অবশ্য প্রতিযোগিতার এই দুনিয়ায় সবাই ব্যস্ত, ক্লান্ত এবং নিজের দিকেই বেশি মনোযোগী। মুখোমুখি কথোপকথনে যে মনোযোগ ও সময় দেওয়া লাগে, সেটিই হয়তো অনেকের কাছে বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাছাড়া দিনের শেষে ক্লান্ত শরীরে কারও সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছাটাও অনেক সময় থাকে না।
এর ফল হিসেবে সম্পর্কগুলোতে ছোটখাটো বিষয়েও রিয়েকশন দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এমনকি বৈবাহিক জীবনেও কমে এসেছে কথাবার্তা। অথচ একসময় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দিনের সব গল্প ভাগাভাগি হতো। এখন বাসায় ফিরেই দু’জন ব্যস্ত দু’জনের ফোনে। প্রয়োজন ছাড়া কথা নেই, নেই কোনো কোয়ালিটি টাইমও।
ড. ইসমত এ প্রসঙ্গে মনে করিয়ে দেন, “আগে মানুষ চিঠি লিখতো, কবিতা লিখতো। এখন ভিডিও কলেই সব সেরে ফেলে। আর সেই কথোপকথনের মাঝেও অভিযোগ বা অপ্রাসঙ্গিক কথাই থাকে বেশি।”
তার মতে, “সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন সম্পর্ক তৈরির মোহ অনেকের কাছেই বেশি, কারণ সেখানে বাস্তবিক দায়িত্ব তুলনামূলক কম। আবার সবাইকে বন্ধু বানানো হচ্ছে না। যিনি ‘প্যাম্পার’ করছেন, লাইক-কমেন্ট দিচ্ছেন, তিনিই হয়ে উঠছেন বন্ধু। এমন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠছে, যার সঙ্গে বাস্তবে দেখা হওয়ার সম্ভাবনাও খুব কম।”
কেবল টিনেজদের ক্ষেত্রেই নয়, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় বলে জানান তিনি।
আগে সম্পর্কে ছোটখাটো ভুল হলে মানুষ তা মেনে নিতে শিখতো। কিন্তু এখন সেই গ্রহণযোগ্যতাও কমে গেছে। কারণ অনলাইনে নিজেদের ‘পারফেক্ট’ রূপ দেখাতে সবাই ব্যস্ত। ফলে বদলেছে বিচার-বিবেচনাও। এখন কারও বাস্তব আচরণের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে তার সোশ্যাল মিডিয়ার ‘শো-অফ’।
অথচ একটা সময় আমাদের জীবনের সবচেয়ে দামী অংশ ছিল সম্পর্ক। কিন্তু ছোট্ট একটি স্ক্রিনের ভিড়ে ধীরে ধীরে ঢেকে যাচ্ছে সেটি। ভার্চুয়াল আলাপ আর ইনস্ট্যান্ট মেসেজের সহজলভ্য যোগাযোগের এই যুগে দিনদিন কাছের মানুষগুলো হয়ে উঠছে অদেখা। কেবল চোখের সামনে থাকা বিষয়গুলোই হয়ে উঠছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।













