২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শেষের পাতা

এক ভ্যাকসিনেই সব সর্দি-কাশি ও ফ্লু থেকে মিলতে পারে মুক্তি, দাবি গবেষকদের

এক ভ্যাকসিনেই সব সর্দি-কাশি ও ফ্লু থেকে মিলতে পারে মুক্তি, দাবি গবেষকদের

গবেষকরা বলছেন, গত ২০০ বছর ধরে টিকা তৈরির যে পদ্ধতি চলে আসছে, এই নতুন পদ্ধতিটি তার চেয়ে একেবারেই আলাদা। মাত্র একটি নাকে দেওয়ার স্প্রে বা নেজাল স্প্রে। তাতেই মুক্তি মিলতে পারে সব ধরনের সর্দি, কাশি ও ফ্লু থেকে। এমনকি এটি ব্যাকটেরিয়াজনিত ফুসফুসের সংক্রমণ এবং অ্যালার্জি থেকেও সুরক্ষা দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের একদল গবেষক এমনটাই দাবি করছেন। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলটি ইতিমধ্যে প্রাণীদের ওপর তাদের এই ‘সর্বজনীন টিকা’র পরীক্ষা চালিয়েছেন। তবে মানুষের ওপর এর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা পরীক্ষা এখনো বাকি।

গবেষকরা বলছেন, গত ২০০ বছর ধরে টিকা তৈরির যে পদ্ধতি চলে আসছে, এই নতুন পদ্ধতিটি তার চেয়ে একেবারেই আলাদা। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা একে ‘সত্যিই উত্তেজনাপূর্ণ’ বলে অভিহিত করেছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও একে তারা ‘বড় ধরনের অগ্রগতি’ হিসেবে দেখছেন। বর্তমানে প্রচলিত টিকাগুলো শরীরকে নির্দিষ্ট একটি সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়তে শেখায়। যেমন হামের টিকা শুধু হামের বিরুদ্ধেই কাজ করে, আবার জলবসন্তের টিকা কেবল জলবসন্ত ঠেকায়। অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে এডওয়ার্ড জেনার টিকা আবিষ্কারের পর থেকে এভাবেই টিকাদান কর্মসূচি চলে আসছে।

কিন্তু সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত এই নতুন পদ্ধতির কথা ভিন্ন। এটি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দেয় না। বরং এটি রোগ প্রতিরোধকারী কোষগুলো একে অপরের সঙ্গে যেভাবে যোগাযোগ করে, তার অনুকরণ করে। এটি নাকে স্প্রে হিসেবে দেওয়া হয়। এর ফলে ফুসফুসে থাকা শ্বেত রক্তকণিকা বা ‘ম্যাক্রোফেজ’গুলো সতর্ক অবস্থায় বা ‘অ্যাম্বার অ্যালার্ট’-এ থাকে। ফলে যে কোনো সংক্রমণ শরীরে ঢোকার চেষ্টা করলেই এরা ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত থাকে।

প্রাণীদের ওপর পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই টিকার প্রভাব প্রায় তিন মাস পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। গবেষকরা দেখিয়েছেন, এই সতর্ক অবস্থার কারণে ফুসফুস ভেদ করে শরীরে ভাইরাস ঢোকার হার ১০০ থেকে ১,০০০ গুণ কমে গেছে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি এবং ইমিউনোলজির অধ্যাপক বালি পুলেন্দ্রান বলেন, ‘যেসব ভাইরাস কোনোমতে ঢুকে পড়ে, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার বাকি অংশ সেগুলোকে নিমেষেই ধ্বংস করে দেয়।’গবেষক দলটি দেখিয়েছে, এই টিকা ‘স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস’ এবং ‘অ্যাসিনেটোব্যাক্টর বাউমানি’ নামের দুই প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধেও সুরক্ষা দেয়।

বিবিসিকে অধ্যাপক পুলেন্দ্রান বলেন, ‘আমরা একে সর্বজনীন টিকা বলছি। এটি ফ্লু, কোভিড বা সাধারণ সর্দির ভাইরাসের বিরুদ্ধে তো বটেই, এমনকি প্রায় সব ধরনের ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধেও কাজ করে। এমনকি এটি অ্যালার্জেন বা অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী উপাদানের বিরুদ্ধেও কার্যকর।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই টিকা যে নীতিতে কাজ করে, তা প্রচলিত সব টিকার কার্যপদ্ধতি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।’

গবেষণায় দেখা গেছে, এটি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়তে এমনভাবে প্রস্তুত করে যে, ধুলাবালি বা ডাস্ট মাইট থেকে হওয়া অ্যালার্জিক অ্যাজমার প্রতিক্রিয়াও কমে যায়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাক্সিনোলজি বা টিকা দপ্তরের অধ্যাপক ড্যানিয়েলা ফ্যারেরা এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তিনি বলেন, ‘এটি সত্যিই চমৎকার একটি গবেষণা।’

তিনি মনে করেন, মানুষের ওপর পরীক্ষায় সফল হলে এটি সর্দি-কাশি ও অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ থেকে মানুষকে রক্ষা করার পদ্ধতিই বদলে দিতে পারে। তিনি আরও বলেন, নতুন ধরনের এই টিকা কীভাবে কাজ করে, গবেষণায় তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এটি একটি ‘বড় পদক্ষেপ’ হতে পারে।
তবে এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলা বাকি।

পরীক্ষায় এটি নাকে স্প্রে হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মানুষের ফুসফুসের গভীরে পৌঁছাতে হলে হয়তো নেবুলাইজারের মাধ্যমে এটি গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে।
মানুষের শরীরেও একই ফল পাওয়া যাবে কি না, বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কতক্ষণ সতর্ক থাকবে—তা এখনো অজানা। ইঁদুর আর মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাছাড়া মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দশকের পর দশক ধরে নানা সংক্রমণের মাধ্যমে গড়ে ওঠে।

তাই গবেষকরা এমন পরীক্ষার পরিকল্পনা করছেন, যেখানে একজনকে টিকা দেওয়ার পর ইচ্ছাকৃতভাবে সংক্রমিত করা হবে। এতে দেখা যাবে শরীর কীভাবে তা মোকাবিলা করে। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সক্রিয় করে তোলার কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও থাকতে পারে। এতে ইমিউন ডিজঅর্ডার বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সমস্যার ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

লিভারপুল স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনের মলিকুলার ভাইরোলজির অধ্যাপক জোনাথন বল বলেন, কাজটি নিঃসন্দেহে ‘উত্তেজনাপূর্ণ’। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আমাদের নিশ্চিত হতে হবে যে শরীরকে অতি-সতর্ক রাখতে গিয়ে যেন হিতে বিপরীত না হয়। অর্থাৎ অতি-সক্রিয় রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যেন শরীরের ক্ষতি করে না বসে।’
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক দলটি মনে করে না যে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে স্থায়ীভাবে অতি-সক্রিয় রাখা উচিত। তারা মনে করেন, প্রচলিত টিকার বিকল্প হিসেবে নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে এই টিকা ব্যবহার করা উচিত।

২০২০ সালের শুরুর দিকে কোভিডের মতো মহামারির প্রাথমিক পর্যায়ে এমন একটি সর্বজনীন টিকা জীবন বাঁচাতে পারে। যখন মূল টিকা তৈরির কাজ চলে, তখন এটি সময় কিনে দিতে পারে। অধ্যাপক পুলেন্দ্রান বলেন, ‘এতে মৃত্যুর হার ও রোগের তীব্রতা কমবে।’
আরেকটি ব্যবহারের ক্ষেত্র হতে পারে শীতের শুরু। যখন শীতকালীন নানা রোগবালাই ছড়াতে শুরু করে, তখন এই মৌসুমি স্প্রে ব্যবহার করে সবগুলোর বিরুদ্ধে সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব হতে পারে।