বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন ও গণভোট শেষে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে বিএনপি ও জামায়াত জোটের নেতারা কেন্দ্র পাহারার জন্য নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন। ভোট শেষে ফলাফল প্রকাশে সময়ক্ষেপণ করলেই কেন্দ্রে সংঘাত সৃষ্টি হবে বলে একটি গোয়েন্দা সংস্থা সূত্র জানিয়েছে। এই সংঘাতে প্রাণহানিও ঘটতে পারে। বিষয়টি এরই মধ্যে সরকারের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যাপ্ত সংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়। একই সঙ্গে তাগিদ দেওয়া হয়েছে ওইসব কেন্দ্রে আগে থেকেই রেকি করার।
জানা গেছে, ভোটের দিন এগিয়ে আসায় এরই মধ্যে নির্বাচনী মাঠ উত্তপ্ত। প্রার্থীরা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, ভোটের ফল প্রকাশে ১২ ঘণ্টার বেশি দেরি হলে সেটিকে অসৎ উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হবে। এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। অনেক প্রার্থী তাদের নেতাকর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার জন্য বলেছেন। ফলাফল ঘোষণায় কোনো ‘ডিলে’ হলেই তা প্রতিহত করা হবে। ব্যালট গণনা শেষ হওয়ার পর ফল প্রকাশ যত পেছাবে, ততই বাড়বে অনিয়মের আশঙ্কা। প্রার্থীদের হুঁশিয়ারি, কোনো অসততার সুযোগ নিয়ে অর্জিত ভোটাধিকার নষ্ট হতে দেওয়া হবে না। সেই কারণেই অনেক প্রার্থী পোলিং এজেন্টদের ফলাফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রে অবস্থানের কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। বিশেষ করে প্রধান দুই দলের জয়ী হওয়ার সম্ভাব্য কেন্দ্রগুলোতে এরই মধ্যে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। সেখানে গুজব ছড়িয়েও সংঘাত বাধাতে পারে তৃতীয় কোনো পক্ষ। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে এই প্রবণতা বাড়তে পারে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এরই মধ্যে ভোটের মাঠে প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের একটা চিত্র দেখা যাচ্ছে। সেখানে ফলাফল প্রকাশ করতে দেরি হলে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা উত্তেজিত হয়ে সংঘাত সৃষ্টি করতে পারেন। এ কারণে জেলার এসপি ও ওসিদের আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারেও বিশেষ অভিযান চালাতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রার্থীদের সঙ্গে পরামর্শ করে নেতাকর্মীদের শান্ত থাকার জন্যও অনুরোধ করা হয়েছে। তবে ওইসব প্রার্থী ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব হলে কর্মীদের শান্ত রাখাটা কঠিন হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন। এ কারণে প্রাণহানিও ঘটতে পারে। বিষয়টি সরকারকে জানানো হয়েছে। দ্রুত ফলাফল প্রকাশের জন্য ইসিকেও অনুরোধ করা হবে।
পুলিশ সদর দপ্তর-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানায়, গোয়েন্দাদের এমন সতর্কতার পর অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবার জনবল, প্রশিক্ষণ ও কৌশলগত বাহিনী মোতায়েনসহ সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, যা দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ১ লাখ ৪৩ হাজার ৫৬৩ জনের তুলনায় বেশি।
পুলিশ সদর দপ্তরের খসড়া নিরাপত্তা পরিকল্পনা অনুযায়ী, লাল ক্যাটাগরির ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতি কেন্দ্রে অস্ত্রধারী পুলিশ ও আনসারসহ ১৬ থেকে ১৭ জন ফোর্স মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। হলুদ ও সবুজ ক্যাটাগরির কেন্দ্রগুলোতেও অস্ত্রধারী পুলিশ সদস্যসহ গড়ে ১৫-১৬ জন নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া প্রতি ৪-৫টি ভোটকেন্দ্রের জন্য আলাদা করে একটি মোবাইল টিম মোতায়েন থাকবে। মহানগর ও জেলার প্রতিটি থানার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে থাকবে আলাদা স্ট্রাইকিং ফোর্স, যা যেকোনো উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দ্রুত হস্তক্ষেপ করবে। পুলিশ সদর দপ্তরের খসড়া হিসাব অনুযায়ী, ভোটকেন্দ্রে স্থায়ী ডিউটিতে থাকবেন ৯৪ হাজার ৩০০ জন পুলিশ সদস্য, মোবাইল ডিউটিতে থাকবেন ২৮ হাজার জন ও স্ট্রাইকিং ফোর্সে থাকবেন ২৭ হাজার ৭০০ জন।
জানা গেছে, ঢাকা-১৪, ১৬ ও ১৮ আসনের মোট ভোটকেন্দ্রের প্রায় ১৮ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গতকাল শনিবার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মিরপুর ক্যাম্প কমান্ডার লে. কর্নেল এসএম ফুয়াদ মাসরুর সংবাদ সম্মেলনে জানান, ঢাকা-১৪ ও ১৬ আসন অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণে ভোটকেন্দ্রগুলোকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, মধ্যম ও সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ- এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভোটারদের নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে আসা-যাওয়া নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সেখানে প্রার্থীদের পাশাপাশি গণমাধ্যম কর্মীদেরও নিরাপত্তা দেওয়া হবে।
এদিকে নিরাপত্তা প্রস্তুতির মাঝেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে একটি গোয়েন্দা সংস্থার অভ্যন্তরীণ সার্ভে। ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করা ওই জরিপ অনুযায়ী, দেশের ১০১টি সংসদীয় আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে। এই আসনগুলোতেই ফলাফল প্রকাশে সামান্য বিলম্ব সংঘাতের আগুনে সরাসরি ঘি ঢালতে পারে।
বিএনিপি এগিয়ে ১৩৫টি আসনে : জনমত জরীপ বলছে, বিএনপি এগিয়ে রয়েছে ১৩৫টি আসনে, যা মোট আসনের প্রায় ৪৫ শতাংশ। জামায়াতে ইসলামী শক্ত অবস্থানে রয়েছে ৩৬টি আসনে (১২ শতাংশ)। ২০টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রভাবশালী (৬.৭ শতাংশ)। এনসিপি, খেলাফত মজলিস, জাতীয় পার্টি, বিজেপি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ অন্যান্য দল মিলিয়ে রয়েছে ৮টি আসনে (২.৬ শতাংশ)। কিন্তু নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণ করবে সেই ১০১টি আসন, যা মোট আসনের ৩৩.৭ শতাংশ। এই আসনগুলোই এখন পুরো নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্লেষকদের মতে, এই হাড্ডাহাড্ডি আসনগুলো এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরাই এবারের নির্বাচনের প্রকৃত ‘কিংমেকার’।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি যদি ৫০ শতাংশ ভোট ধরে রাখতে পারে, সরকার গঠনের পথে তারা এগিয়ে থাকবে। না পারলে সেই ১০১টি হাড্ডাহাড্ডি আসনই চূড়ান্ত ফয়সালা করে দেবে। আর ঠিক এখানেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি- ফলাফল প্রকাশে সামান্য দেরি, অস্পষ্টতা কিংবা স্বচ্ছতার ঘাটতি পুরো দেশকে ঠেলে দিতে পারে সংঘাত, অচলাবস্থা ও অস্থিতিশীলতার দিকে।
এ বিষয়ে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) সাংবাদিকদের বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য প্রশিক্ষণ, বডি ওর্ন ক্যামেরা ক্রয়, প্রতিটি কেন্দ্রে বিদ্যুতের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণসহ সংসদ নির্বাচনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, নিরাপদ, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদা প্রস্তুত। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ঘটানোর চেষ্টা করলে তা পেশাদারত্ব বজায় রেখে মোকাবিলা করবে নিরাপত্তায় নিয়োজিতরা।