আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবং এনসিপির সমর্থন জামায়াতকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে এসেছে৷
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দেড় বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট৷ কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে নির্বাচনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছে একসময়ের ঘনিষ্ট মিত্র বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী৷ বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলামী একসময় বিএনপির সঙ্গে জোট করে সরকার গঠন করেছিল, মন্ত্রিসভায় দলটির দুজন মন্ত্রীও ছিলেন৷
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসলামপন্থি দলগুলোকে নিয়ে একটি একক জোট গঠনের চেষ্টা চালিয়ে এসেছে জামায়াতে ইসলামী৷ শেষ পর্যন্ত চরমোনাইয়ের পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন এই জোটে না গেলেও অন্য নানা ইসলামী দল এ জোটে একত্রিত হয়েছে৷
তবে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া শিক্ষার্থীদের একাংশের গড়ে তোলা দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি- এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোটে যোগ দেয়ায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা৷ অনেকেই মনে করছেন, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবং এনসিপির সমর্থন জামায়াতকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সর্বোচ্চ সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে এসেছে৷ এ নিয়ে কী ভাবছেন অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ- ডাকসুর সহ-সভাপতি এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক সাদিক কায়েম মনে করেন, দেশজুড়ে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে একটি নীরব বিপ্লব হয়ে গেছে৷ সাদিককে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের যে অবস্থান, সেটার দায় ছাত্রশিবির কেন নিচ্ছে? উত্তরে ডিডাব্লিউকে সাদিক বলেন, ‘‘এ জায়গায় আমরা আমাদের অবস্থান বারবার পরিষ্কার করেছি৷ ইসলামী ছাত্রশিবির বারবারই বলছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতার প্রশ্নে আমরা আপসহীন৷”
তিনি মনে করেন, এই প্রশ্নগুলো বারবার তোলা হয় ‘আমরা বনাম তারা’ বয়ান তৈরির জন্য৷ তিনি বলেন, ‘‘১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য আমিরে জামায়াত যারা ছিলেন, তারা বারবারই পাবলিকলি অ্যাপলজি করেছেন৷ এটা তাদের পলিটিক্যাল স্ট্যান্ড ছিল, সেটা তারা স্বীকারও করেন৷ এই অ্যাপোলজিগুলোকে আমাদের অ্যাপ্রিশিয়েট করা দরকার৷”
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আবিদুল ইসলাম খান জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে ভোটের জন্য ধর্মকে কাজে লাগানোর অভিযোগ তুলেছেন৷ জামায়াতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তা করা ও যুদ্ধাপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে ধরে ডিডাব্লিউকে তিনি বলেন, ‘‘এখন তারা (জামায়াত) বলছে, অনেক তো নৌকা দেখলেন, ধানের শীষ দেখলেন, লাঙল দেখলেন, এবার দাঁড়িপাল্লা দেখেন৷ তাহলে অটোম্যাটিক্যালিই তো এই প্রশ্ন আসে, আপনাদের তো দেখা হয়েছে ৭১ সালে৷”
একই ধরনের কথা বলেছেন ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল কাদেরও৷ জামায়াতের সঙ্গে জোট করে এনসিপি ‘জনগণের সঙ্গে প্রতারণা’ করেছে বলে মনে করেন কাদের৷
ডিডাব্লিউকে তিনি বলেন, ‘‘আপনারা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি জনগণকে দিলেন৷ কিন্তু তার বদলে আপনারা পুরাতন বন্দোবস্তের দিকে ঝুঁকে গেলেন৷ এখন আপনারা জামায়াতের সঙ্গে গিয়েছেন, পারলে হয়তো বিএনপির সঙ্গেও যেতেন৷ এটা কি প্রতারণা না?”
তিনি বলেন, ‘‘জামায়াতকে আমরা ১৯৭১ সালেই দেখে এসেছি৷ এখন তারা বিএনপির দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে আনে৷ কিন্তু তারাও বিএনপির সঙ্গে জোট সরকারে ছিল, তাদের দুইজন মন্ত্রী ছিল, তখন তারা দুর্নীতির কথা বলে পদত্যাগ করে নাই কেন!”
এনসিপি রাজনৈতিক ঐক্য তৈরির দিকে কোনো মনোযোগ দেয়নি বলে মনে করেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক উমামা ফাতেমা৷ বরং জামায়াতকে সচিবালয়সহ নানা জায়গায় ক্ষমতায়ন করা হয়েছে বলে মনে করেন উমামা৷
ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘সেপ্টেম্বরের দিকে (২০২৪ সালের) বিভিন্ন সচিবালয়ের পোস্টিংয়ে, জামায়াতের লিংকের লোকজনকে বিভিন্ন জায়গায় পদায়ন করা হয়েছে৷ এক ধরনের সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছিল, যেকোনো ফাইল পাস হতে হলে সেই সিন্ডিকেট পাস হয়েই যেতে হয়৷ আর সেই সিন্ডিকেট পাস হতে পারে কেবল জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা৷” উমামা বলেন, ‘‘ছাত্র প্রতিনিধিদের মধ্যেও যারা জামায়াতের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ট, তারাই এখানে বেশি সুযোগ পেয়েছে৷”
জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোটের বিরোধিতা করলেও দলের মধ্য থেকেই সে অবস্থানের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন৷ ডিডাব্লিউকে তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশে জামায়াতের শক্তিশালী অবস্থান আওয়ামী লীগের ফিরে আসার পথ সুগম করছে৷”
জামায়াতের সঙ্গে জোট করায় অনেক তরুণ ভোটারও ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলে জানান সামান্তা৷ তিনি বলেছেন, ‘‘আমাকে অনেকেই বলেছে, আমরা তো তোমাদেরই ভোট দিতাম৷ এখন আমরা কাকে ভোট দিবো?”
৩০০ আসনে একক প্রার্থী দিয়ে ভোটে না জিতলেও দেশজুড়ে দল হিসাবে এনসিপির সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী হতো বলে মনে করেন তিনি৷ তবে জামায়াত বা বিএনপির সঙ্গে জোট সেই সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দিয়েছে বলেও মনে করেন সামান্তা৷
জামায়াতে ইসলামীকে নির্ভরশীল মিত্র বলে মনে করেন না সামান্তা৷ ডিডাব্লিউকে তিনি বলেন, ‘‘নির্ভরযোগ্য মিত্র হওয়ার জন্য ঐতিহাসিক যে কয়টা কথা রাখার ব্যাপার থাকতে পারে, আপনি দেখুন, জামায়াতের ইতিহাসে সেটা আছে কিনা৷”
তিনি বলেন, ‘‘ইতিহাসে জামায়াত যতবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছে, ততবারই তারা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ এবারাও নিম্নকক্ষে পিআর ইস্যু বা জুলাই সনদে সাক্ষর নিয়ে তাদের বক্তব্য একধরনের এবং পরবর্তী তাদের কাজ তার বিপরীত হয়েছে৷”
এক্ষেত্রে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে জামায়াতের অবস্থান নেয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন সামান্তা৷ ২০২৪ সালে এসে এই প্রথম জামায়াত তাদের নিজেদের অবস্থানকে জনগণের অবস্থানের সঙ্গে এক জায়গায় আনতে পেরেছে৷ তবে সেটিও জামায়াতের নিজের রাজনৈতিক সাফল্যের চেয়ে আওয়ামীগ লীগের স্বৈরাচারী ও নিবর্তনমূলক আচরণকে বড় কারণ বলে মনে করেন সামান্তা৷ অনুপম দেব কানুনজ্ঞ (ঢাকা থেকে ফিরে জার্মান বেতার ডয়চে ভেলের প্রতিনিধি)