১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

জামায়াত, যুক্তরাষ্ট্র, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ এবং নির্বাচনে কৌশল

সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জামায়াতকে বন্ধু হিসাবে পেতে চায় যুক্তরাষ্ট্র৷ তবে এক সপ্তাহের মধ্যেই ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, জনগণের নির্বাচিত যে-কোনো সরকারের সাথে কাজ করতে প্রস্তুত যুক্তরা

বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, জামায়াতে ইসলামী আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় সবগুলো চ্যানেলেই এগিয়ে গেছে৷ তাদের নিয়ে পশ্চিমাদের আপাতত কোনো অস্বস্তি নেই এবং এর ফলে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপির সঙ্গে জামায়াত শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলবে বলেও মনে করেন তারা৷

তবে বিশ্লেষকদের আরেক অংশে এ বিষয়ে প্রবল ভিন্নমতও আছে৷ তারা মনে করেন, জামায়াতকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আসলে একটি কূটকৌশল করছে৷ যুক্তরাষ্ট্র আসলে বাংলাদেশে একটি দুর্বল সরকার চায়, যার সহায়তায় তারা তাদের সুবিধাগুলো আদায় করে নিতে পারেবে৷ বিশ্লেষকদের এই অংশ আরো মনে করেন, জামায়াতের এখন যে ‘চেহারা’ দেখা যাচ্ছে, সেটা ‘আসল চেহারা’ নয়, তাদের ‘আসল চেহারা’ ১৯৭১ সালে দেখা গেছে৷ তারা যদি কখনো ক্ষমতায় যায়, তাহলে আবার সেই ‘আসল চেহারা’ দেখা যাবে৷

যা আছে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে : গত ২২ জানুয়ারি ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি ঢাকায় কয়েকজন নারী সাংবাদিকের সঙ্গে মার্কিন কূটনীতিকের বৈঠকের অডিওর ওপর ভিত্তি করে তৈরি৷ ফাঁস হওয়া অডিওকে উদ্ধৃত করে সেখানে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়৷ বৈঠকে মার্কিন কূটনীতিকরা ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো ফল করতে পারে- এমন ধারণা ব্যক্ত করেন৷
ওয়াশিংটন পোস্টের সেই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ‘‘চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নব উদ্যমে এগিয়ে যাওয়া ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র৷’’ বৈঠকে মার্কিন কূটনীতিক বলেন, ‘‘আমরা তাদের (জামায়াতে ইসলামী) বন্ধু হিসাবে চাই৷’’
সরকার গঠন করলে জামায়াতে ইসলামী যদি শরিয়া আইন চাপিয়ে দেয় কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দ নয় এমন কোনো পদক্ষেপ নেয় তাহলে কী হবে – এমন প্রশ্নের জবাবে বলা হয়, সেক্ষেত্রে ওয়াশিংটন প্রভাব খাটাবে৷ তারা মনে করেন জামায়াত শরিয়া চাপিয়ে দেবে না৷ এবং সেরকম কিছু করলে যুক্তরাষ্ট্র পরদিনই ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দিতে পারে – এমন কথাও বলা হয় ওয়াশিংটন পোস্টের বহুল আলোচিত সেই প্রতিবেদনে৷
মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই ওয়াশিংটন পোস্ট-এর কাছে ওই বৈঠকের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘‘ডিসেম্বরে মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তা ও স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে রুটিন বৈঠক ও অপ্রকাশযোগ্য আলোচনা হয়েছিল৷’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘আমি মনে করি না যে, জামায়াত শরিয়া চাপিয়ে দেবে৷ যদি দলটির নেতারা উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র পরদিনই ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দিতে পারে৷’’
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ‘আশ্বাস’
এদিকে গত সপ্তাহে (বুধবার) নির্বাচন কমিশনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসিরউদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে ঢাকায় নব নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিষ্টেনসেন বলেছেন, ‘‘বাংলাদেশের জনগণ যে সরকারকে নির্বাচিত করবে, যুক্তরাষ্ট্র সেই সরকারের সাথেই কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছে৷’’
‘মডারেট জামায়াত’ সাময়িক ‘কৌশল’?
এবারের নির্বাচনে জামায়াতের টার্গেট ছিল ইসলামপন্থি সব দলের ভোট এক বাক্সে আনা৷ কিন্তু ইসলামী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ১১ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যায়৷ তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া তরুণদের দল এনসিপি যোগ দেয়ায় জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট নতুন মাত্রা পেয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ৷

সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘জামায়াতের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, তারা পশ্চিমাদের গুডবুকে রয়েছে৷ তাদের নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অস্বস্তি নেই৷ বরং তারা জামায়াতকে বন্ধু হিসাবে পেতে চায়৷’’

তার কথা, ‘‘আমার মনে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জামায়াতের অনেক দিন ধরেই কথা বা সাক্ষাৎ হচ্ছে৷ জামায়াতের প্রতিনিধি দল ওয়াশিংটনে স্টেট ডিপার্টমেন্টেও গিয়েছিল৷ আরেকটা বিষয় হলো, অন্যান্য দলের ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে এখানকার (দূতাবাস) থেকে অভিযোগ গেছে৷ কিন্তু জামায়াতের ব্যাপারে অফিসিয়াল কোনো অভিযোগ গেছে বলে আমার জানা নেই৷ জামায়াতকে তারা একটা মডারেট ইসলামী দল বলে মনে করে৷’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘জামায়াত আসলে বাস্তবতা বিবেচনা করে তাদের রাজনৈতিক কৌশল নিয়েছে৷ এর ফলে দুই বছর আগেও কেউ চিন্তা করতে পারেনি যে, জামায়াত ক্ষমতার দাবিদার হবে৷ অনেক সময় একটি ‘ন্যারোবেজড পার্টি’ কিন্তু ক্ষমতায় চলে যেতে পারে৷ কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে হলে ‘বিগ টেন্ট পার্টি’ হতে হয়৷ এক তাঁবুর নীচে সবাইকে ধারণ করতে হয়৷ জামায়াত সেই চেষ্টা করছে বলে আপাতত মনে হচ্ছে৷ এজন্যই তারা তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে বলেছিল, নির্বাচনে যে-ই জিতুক যেন জাতীয় সরকার হয়৷’’

তবে সাবেক এই কূটনীতিক বলেন, ‘‘এটাকে আমি ইসলামপন্থার উত্থান হিসাবে দেখছি না৷ জামায়াত কিছু ইস্যু সামনে নিয়ে এসেছে৷ আবার শরিয়া আইনের ব্যাপারেও এখন কিছু বলছে না৷ তারা চাঁদাবাজি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে৷ ইনসাফের কথা বলছে৷ এইভাবে কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ এ পর্যন্ত যে কয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয়েছে, সব কটিতে তারা জয় পেয়েছে৷ এতে তরুণদের মধ্যে তাদের নিয়ে আগ্রহ বোঝা যায়৷ তারা কিন্তু সবাই ইসলামী শাসন কয়েমের জন্য ভোট দেয়নি৷’’

জামায়াতের বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধার বিশ্লেষণ একেবারেই অন্যরকম৷ তিনি মনে করেন, ‘‘জামায়াত কোনো মডারেট দল নয়৷ তারা এখন কৌশলগত কারণে তাদের মূল চরিত্র লুকিয়ে রাখছে৷ ১৯৭১ সালে তাদের আসল রূপ এ দেশের মানুষ দেখেছে৷ তারা যদি কখনো ক্ষমতায় যেতে পারে, তাহলে তাদের আসল রূপ আবার দেখা যাবে৷’’

ডয়চে ভেলেকে তিনি আরো বলেন, ‘‘তারা যতই চেষ্টা করুক তারপরও এই সময়ে, বিশেষ করে নানা ঘটনায় নারীদের নিয়ে তাদের অবস্থান প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে, তারা নারীকে পুরুষের অধীনে রাখতে চায়৷ ঘরে রাখতে চায়৷ আর তারাতো একজন নারীকেও নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়নি৷ তাহলে তারা মডারেট কীভাবে হয়?’’

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘গুডবুকে’ রয়েছে জামায়াত- এ ধারণা সম্পর্কে তার বক্তব্য, ‘‘যুক্তরাষ্ট্র এখন বিভিন্ন উপায়ে মুসলিম দেশে প্রবেশ করছে৷ বাংলাদেশেও তারা একটি অনুগত সরকার চায়৷ আর সেই সরকারটি দুর্বল ও বিতর্কিত হলে তাদের সুবিধা৷ তাহলে বাংলাদেশে তাদের যে নানা ধরনের পরিকল্পনা আছে, সেটা বাস্তবায়ন করতে পারবে৷ চাপ দিতে পারবে৷ সেক্ষেত্রে জামায়াত তাদের জন্য ভালো হবে বলে তারা মনে করছে৷ আমরা যদি কয়েকটি মুসলিম দেশের দিকে তাকাই, তাহলে দেখবো যুক্তরাষ্ট্র সেইসব দেশে এভাবেই অনুপ্রবেশ করেছে৷ তাই তারা জামায়াতের দিকে ঝুঁকছে৷ অন্য কোনো কারণ নেই৷’’

অধ্যাপক ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা মনে করেন, ‘‘জামায়াত অনেকটা শেয়াল মামার মতো৷ তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলছে৷ কিন্তু তারা যখন নিয়োগের সুযোগ পায়, দলীয় লোকজনকে নিয়োগ দেয়৷ তারা যখন ২০০১ সালে বিএনপির সাথে সরকারে ছিল, তাদের দুইজন মন্ত্রী ছিল, তখন কিন্তু দুর্নীতির কথা বলেনি৷ তারা গণতন্ত্রের কথা বলে নিজেদের মতাদর্শ চাপিয়ে দেয়৷ জুলাই সনদে জামায়াত সই করেছে৷ কিন্তু সনদ মানছে না৷ ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কথা বলছে৷ কিন্তু জুলাই সনদে যে পাঁচ শতাংশ নারী মনোনয়ন দেয়ার কথা আছে সেটা কিন্তু তারা করেনি৷ এটা তো প্রতারণা৷ ফলে, জামায়াতের সততার জায়গাটি তো প্রশ্নবিদ্ধ!’’

১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় নির্বাচনে ইতিহাসে তাদের সর্বোচ্চ ১৮টি আসন পেয়েছিল জামায়াত৷ এরপর ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তারা বর্জন করে৷ ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত পায় তিনটি আসন৷ এর পরের অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে আবার জোট করে তারা আসন পায় ১৭টি৷ এরপর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পায় মাত্র দুটি আসন৷ এককভাবে জামায়াত সর্বোচ্চ তিনটি আসন পেয়েছে৷ তখন তাদের ভোট গড়ে পাঁচ শতাংশের বেশি ছিল না৷
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়৷ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়৷ ফলে তারা ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না৷ এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন পর জামায়াত বিএনপির ‘ছায়া’ থেকে বের হয়ে এখন বিএনপিরই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী৷ বিভিন্ন জরিপে বিএনপি ও জামায়াতের ভোট কাছাকাছিই দেখানো হয়েছে৷

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘জামায়াতের জন্য ক্ষমতায় যাওয়ার একটা সম্ভাবনা অলরেডি তৈরি হয়ে গেছে৷ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিবের বিজয় তো সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে৷ তারা তো পরিকল্পনামাফিক এগোচ্ছে৷ কিন্তু ক্ষমতায় না গেলেও জামায়াত যদি এবার শক্তিশালী বিরোধী দলও হয় সেটাও তো তাদের জন্য হবে বড় অর্জন৷ তারা তো অতীতে এককভাবে তিনটির বেশি আসন পায়নি৷ এবার যদি ৩০-৪০টি আসনও পায়, তাহলেও তো জামায়াতের বড় ধরনের উত্থান হবে৷’’
‘‘আর যে অডিওর কথা বলা হচ্ছে, সেটা যদি সঠিক হয়, তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তাদের প্রতি যে ঝোঁক, তা বোঝা যায়৷ জামায়াত ওই ফ্রন্টেও কাজ করেছে৷ নানাভাবেই এটা স্পষ্ট যে, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও তাদের দিকে আনতে সক্ষম হয়েছে৷ এটা খুবই সিগনিফিক্যান্ট,’’ বলেন তিনি৷
তবে তিনি মনে করেন, কৌশলগত কারণে এখন যে অবস্থানেই থাকুক, ভবিষ্যতে জামায়াত ‘ইসলামী রাজনৈতিক দর্শন’ বাস্তবায়নের দিকে এগোবে৷ ‘‘জামায়াত তো ইসলামকে ছেড়ে দেবে না৷ তাহলে তো তাদের রাজনীতি থাকবে না৷ তারা আপাতত কম্প্রোমাইজ করছে৷ কিন্তু ভবিষ্যতে তাদের যে ইসলামী রাজনৈতিক দর্শন, সেটা বাস্তবায়নের দিকে আস্তে আস্তে এগোবে,’’ বলেন তিনি৷
সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামালও মনে করেন জামায়াতের বর্তমান অবস্থান এবং বক্তব্য দীর্ঘস্থায় হবার নয়৷ তার ভাষায়, ‘‘জামায়াত আসলে অভিনয় করছে৷ তারা এখন যা বলছে তা লোক দেখানো৷ তাদের আসল চরিত্রের কোনো পরিবর্তন হয়নি৷ হবেও না৷ আমরা হয়তো জামায়াত নেতা শিশির মনির বা ড. গালিবকে দেখছি৷ কিন্তু জামায়াতকে বুঝতে হলে তাদের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা দেখতে হবে৷ সেখানে কারা আছে? তারা কিন্তু জামায়াতের মূল চালিকাশক্তি৷ তারাই নির্ধারণ করে জামায়াতের পলিসি৷ এই দলটি যদি ক্ষমতায় যায়, তাহলে তারা আদের আসল চরিত্র প্রকাশ করবে৷ এখন যা বলছে তা তারা করবে না৷’’

মাসুদ কামাল আরো বলেন, ‘‘জামায়াত যেহেতু কখনোই পুরোপুরি ক্ষমতায় ছিল না৷ ফলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তাদের দুর্নীতির তেমন কোনো রেকর্ড নেই৷ কিন্তু ক্ষমতায় গেলে কী করবে তা তো এখনই বলা যাচ্ছে না৷ খালেদা জিয়ার কেবিনেটে শিল্প ও সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দুইজন মন্ত্রী ছিল তাদের৷ ওই দুই মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি তুলনামূলক কম হয়েছে বলে মনে হয়৷ কিন্তু দুর্নীতি হয়নি তা তো বলা যায় না৷ আর তারা ওই দুই মন্ত্রণালয়ে তো আহামরি কোনো কাজ দেখাতে পারেনি৷ আমরা আসলে দুর্নীতির মহোৎসব দেখে অভ্যস্ত৷ ফলে বিবেচনটা সেরকম হচ্ছে৷’’

আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতের সম্ভাবনা : ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের আরেক শিক্ষক অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, ‘‘এবারের নির্বাচনে তরুণদের একটা বড় ভূমিকা থাকবে৷ তারা প্রায় ৪০ শতাংশ৷ ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায় তাদের প্রতি তরুণদের একটা ঝোঁক আছে৷ আমার ধারণা, নির্বাচনে জামায়াত বেশ ভালো করবে৷ কিন্ত সম্ভবত ক্ষমতায় যেতে পারবে না৷ তা না হলেও তাদের খুব বড় ধরনের উত্থান হবে বলে মনে হচ্ছে৷’’

আসন্ন নির্বাচনে সার্বিকভাবে ইসলামী দলগুলোর সম্ভাবনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘‘তারা (জামায়াত) নিজেদের মডারেট ইসলামী দল হিসাবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে৷ এটা তাদের সুবিধা দিচ্ছে৷ কিন্তু কিছু কিছু ইসলামী দল ডগমেটিক৷ ফলে এটাকে ইসলামপন্থার ঠিক উত্থান বলা যাবে না৷ জামায়াত সুনির্দিষ্ট কিছু ইস্যু সামনে এনে অবস্থান শক্ত করছে৷ তারা সন্ত্রাস, দুর্নীতি, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে৷ বলছে, সব দলকে তো দেখা হয়েছে, তাদের একবার সুযোগ দেয়া হোক৷ তারা কিন্তু ইসলামী আইন ও শাসন ব্যবস্থার কথা সামনে আনছে না৷ তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কথাই বলছে৷’’

তিনি মনে করেন, ‘‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জামায়াতের সঙ্গে না থাকায় সব ইসলামী দলের ভোট এক বাক্সে আনার যে পরিকল্পনা জামায়াত নিয়েছিল, সেটা সফল না হলেও তারা এনসিপি এবং অন্য ইসলামী দলকে সাথে নিতে পেরেছে৷ আর তারা প্রথম থেকেই গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে৷ এটার অন্য ধরনের গুরুত্ব আছে৷’’

তবে সাংবাদিক মাসুদ কামাল মনে করেন, ‘‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতকে ক্ষমতায় দেখতে চায় বা জামায়াতকে বন্ধু হিসাবে পেতে চায়, অন্যদের ব্যাপারে চায় না-এই বয়ান আমার কাছে সঠিক মনে হয় না৷ কারণ, আমরা জামায়াতকে নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মার্কিন কূটনীতিকদের বৈঠকের কথা জানতে পেরেছি৷ এরকম বৈঠক তারা হয়তো বিএনপিকে নিয়েও করেছে, যেটা ফাঁস হয়নি৷ তাই আমরা জানি না৷ আমার মনে হয় না, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো বিশেষ দলের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে৷’’

তিনি বলেন, ‘‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পরপর পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হল সংসদে শিবিরের জয়ে তরুণ ভোটারদের মধ্যে জামায়াত আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পেরেছে বলে মনে হচ্ছে৷ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়ী হলে ধরে নেয়া যেতো এটা একটি দুর্ঘটনা৷ এটা জাতীয় নির্বাচনে কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলবে৷ কারণ, এবার তরুণ ভোটাররা সংখ্যায় অনেক৷ তবে এটা জামায়াতকে ক্ষমতায় যাওয়ার মতো সুবিধা দেবে বলে মনে হয় না৷’’

‘‘কিন্তু ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে তারা জয়ী হয়েছে, সেখানে তাদের দৌরাত্ম শুরু হয়েছে৷ এরই মধ্যে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিরক্ত হচ্ছে৷ প্রতিবাদও হচ্ছে৷ এটা তাদের জন্য আবার নেতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে৷ তরুণরা বুঝতে পারছে, ক্ষমতায় যাওয়ার আগে তারা কী এবং ক্ষমতায় যাওয়ার পরে তাদের চরিত্র কেমন হয়৷ এটাও কিন্তু জামায়াতের চরিত্র বুঝতে সহায়তা করছে,’’ বলেন মাসুদ কামাল৷

তিনি আরো বলেন, ‘‘আমরা ভোটের হিসাব করি ২০০৮ সালের নির্বাচন দিয়ে৷ কিন্তু তারপর ১৫-১৬ বছরে ভোটের প্যাটার্নে কী পরিবর্তন এসেছে তা কিন্তু আমরা জানি না৷ আমার মনে হয়, আগে যে জামায়াতের চার-পাঁচ শতাংশ ভোট ছিল, তার চেয়ে তাদের ভোট অনেক বেড়ে যাবে৷’ – হারুন উর রশীদ স্বপন, জার্মান বেতার ডয়চে ভেলে, ঢাকা