যৌন পাচারের অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে নিজের সম্পর্কে ‘জঘন্য’ সংবাদ প্রকাশের বিষয়ে প্রখ্যাত ভাষাবিদ ও চিন্তাবিদ নোয়াম চমস্কির পরামর্শ চেয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিন। মার্কিন সরকারের তদন্তসংক্রান্ত সর্বশেষ প্রকাশিত নথিগুলোতে এপস্টিন ও চমস্কির মধ্যে আদান-প্রদান করা ইমেইল থেকে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাঠানো এক ইমেইলে এপস্টিন জানতে চান, নিজের বিরুদ্ধে প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে তার ‘নিজেকে রক্ষা করা’ উচিত হবে, না-কি বিষয়টি ‘উপেক্ষা করার চেষ্টা’ করা ভালো।
জবাবে চমস্কির বলে মনে করা একটি ইমেইলে এপস্টিনের প্রতি ‘ভয়াবহ আচরণ’ এবং ‘নারীদের নির্যাতন নিয়ে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে’—তা নিয়ে খেদ প্রকাশ করা হয়। ওই ইমেইলে বলা হয়, ‘বলতে খুব খারাপ লাগছে, তবে আমার মনে হয় এর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো একে উপেক্ষা করা।’
এপস্টিনকে নিয়ে মার্কিন সরকারের তদন্তের সর্বশেষ প্রকাশিত নথিগুলোতেই এই কথোপকথনের উল্লেখ রয়েছে। মন্তব্যের জন্য বিবিসি নোয়াম চমস্কির স্ত্রী ভ্যালেরিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, যিনি তার মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন। তবে ফাইলে চমস্কির নাম থাকার অর্থ এই নয় যে তিনি কোনো অপরাধ করেছেন।
নথিপত্রে দেখা যায়, একাডেমিক গবেষণাপত্র থেকে শুরু করে সাক্ষাৎ আয়োজন—এমন নানা বিষয়ে এপস্টিন, নোয়াম চমস্কি ও ভ্যালেরিয়ার মধ্যে নিয়মিত চিঠিপত্র আদান-প্রদান হতো।
জেফরি এপস্টিনকে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ওই বছরের আগস্টে যৌন পাচারের অভিযোগে বিচার শুরুর অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় নিউ ইয়র্কের একটি জেলকক্ষে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
এর আগে, ২০২৩ সালে ৯৭ বছর বয়সে নোয়াম চমস্কি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে এপস্টিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে বলেছিলেন, ‘প্রথম উত্তর হলো, এটা আপনার বা অন্য কারো দেখার বিষয় নয়। দ্বিতীয়ত, আমি তাকে চিনতাম এবং আমাদের মাঝে মাঝে দেখা হতো।’
মিয়ামি হেরাল্ড ২০০৮ সালে ফেডারেল যৌন পাচারের অভিযোগের বিচার এড়াতে এপস্টিনের করা একটি ‘প্লী ডিল’ বা সমঝোতা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের সময় চমস্কিকে ওই ইমেইলটি পাঠিয়েছিলেন এপস্টিন। ইমেইলে তিনি লেখেন, ‘নোয়াম, আমার সম্পর্কে জঘন্য সব সংবাদ কীভাবে সামলাব, সে বিষয়ে আমি আপনার পরামর্শ চাই।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, গণমাধ্যমের সংবাদগুলো ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে’।
এপস্টিন জানতে চান, ‘আমি কি কাউকে দিয়ে অপ-এড (মতামত কলাম) লেখাব? নিজেকে রক্ষা করব? নাকি উপেক্ষা করার চেষ্টা করব? বুঝতে পারছি যে উন্মত্ত জনতা বিপজ্জনক।’
নথিতে নোয়াম চমস্কি হিসেবে চিহ্নিত অ্যাকাউন্ট থেকে পাঠানো উত্তরে বলা হয়, ‘শকুনেরা যা চায় তা হলো আপনার প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া, যা বিষাক্ত আক্রমণের সুযোগ করে দেয়। এর বেশিরভাগই আসে প্রচারপিপাসু বা একরোখা মানুষদের কাছ থেকে।’ একই ইমেইলে আরও বলা হয়, ‘নারীদের নির্যাতন নিয়ে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে এটি এখন আরও সত্য। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কোনো অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যেন খুনের চেয়েও বড় অপরাধ।’
নথিতে আরও দেখা যায়, সুদের অর্থ প্রদান এবং নিজেদের আর্থিক বিষয় নিয়ে সন্তানদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলা উচিত—সে বিষয়ে পরামর্শের জন্য এপস্টিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন নোয়াম চমস্কি ও তার স্ত্রী ভ্যালেরিয়া।
২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ভ্যালেরিয়া চমস্কি হিসেবে চিহ্নিত একটি ইমেইল ঠিকানা থেকে লেখা হয়, ‘এন (নোয়াম) নিচের চিঠিটি তার সন্তানদের পাঠাতে চায়। কোনো পরামর্শ? কিছু যোগ করতে হবে?’ ইমেইলের শেষে লেখা ছিল, ‘নিঃসংকোচে পরামর্শ দিন। আমরা আপনাকে বিশ্বাস করি।’
এপস্টিন ও চমস্কির মধ্যে চিঠিপত্রের বিষয়টি আগের প্রকাশিত নথিতেও উঠে এসেছিল। গত বছর প্রকাশিত নথিগুলোতে দেখা যায়, বছরের পর বছর ধরে তারা একাধিক বার্তা বিনিময় করেছেন এবং এপস্টিন চমস্কিকে নিজের বাড়িতে থাকার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
ইমেইলের স্তূপে পাওয়া তারিখবিহীন একটি সমর্থনসূচক চিঠিতে চমস্কি উল্লেখ করেন, তাদের দুজনের মধ্যে ‘অনেক দীর্ঘ এবং প্রায়ই গভীর আলোচনা’ হয়েছে।