এপস্টিন ২০১৯ সালে মারা গেছেন। কিন্তু তার কেলেঙ্কারির ঢেউ এখনো থামেনি। একের পর এক তথ্যপ্রমাণ তাকে যৌনতা, অর্থ ও ক্ষমতার এক বিশাল জালের কেন্দ্রে দাঁড় করিয়েছে। এই জালে জড়িয়ে আছেন বিশ্বের অনেক ধনী ও ক্ষমতাধর ব্যক্তি।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (ডিওজে) প্রায় ৩০ লাখ নথিপত্র প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, শুধু জঘন্য যৌন অপরাধই নয়, এপস্টিনের মাথায় মানবজাতিকে ‘উন্নত’ করার এক অদ্ভুত নেশা চেপেছিল। তিনি জিনতত্ত্ব বা জেনেটিক্স নিয়ে রীতিমতো আচ্ছন্ন ছিলেন।
নতুন নথিতে বর্ণবাদী ও লিঙ্গবৈষম্যমূলক কথোপকথনের প্রমাণ মিলেছে। তিনি ‘ট্রান্সহিউম্যানিজম’-এর ভক্ত ছিলেন। এটি দর্শনের এমন এক শাখা, যা ইউজেনিক্স (উন্নত প্রজনন বিজ্ঞান) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধারণাকে একত্র করে। জানা গেছে, জিন এডিটিং বা জিন সম্পাদনা নিয়ে কাজ করা একটি কোম্পানিকে অর্থায়ন করার জন্য তিনি অনেক দূর এগিয়েছিলেন। এমনকি নির্দিষ্ট কিছু জাতিগত বৈশিষ্ট্য, যেমন নীল চোখের প্রতি তার বিশেষ দুর্বলতা ছিল।
সবচেয়ে আপত্তিকর বিষয়গুলো ছিল জাতি বা বর্ণ নিয়ে। ২০০৮ সালে প্রথমবার দোষী সাব্যস্ত হওয়া এপস্টিন বিশ্বাস করতেন, জিনগত কারণেই কৃষ্ণাঙ্গরা শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে কম বুদ্ধিমান। ২০১৬ সালে ভাষাবিদ ও অ্যাক্টিভিস্ট নোয়াম চমস্কিকে লেখা এক ইমেইলে তিনি দাবি করেন, ‘আফ্রিকান আমেরিকানদের পরীক্ষার স্কোরে পিছিয়ে থাকার বিষয়টি সুপ্রমাণিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘পরিস্থিতি ভালো করতে হলে কিছু অস্বস্তিকর সত্য মেনে নিতে হবে।’
জার্মান কগনিটিভ সায়েন্টিস্ট জোশা বাখের সঙ্গে তার ইমেইল চালাচালিতে আরও ভয়ানক ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এআই জগতের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব বাখ তখন এমআইটিতে কাজ করতেন এবং এপস্টাইনের কাছ থেকে ৩ লাখ পাউন্ড অনুদান পেয়েছিলেন। ইমেইলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, এপস্টিন কৃষ্ণাঙ্গদের জিন পরিবর্তন করে তাদের ‘স্মার্ট’ বা বুদ্ধিমান বানানোর সম্ভাব্যতা নিয়ে আগ্রহী ছিলেন।
২০১৬ সালের জুলাইয়ে বাখ এপস্টিন লেখেন, ‘আমি যদি ঠিক বুঝে থাকি, আপনি বলছেন… কৃষ্ণাঙ্গদের মোটর লেয়ার বা শারীরিক বিকাশের সময় পরিবর্তন করে তাদের স্মার্ট করা সম্ভব।’
তাদের এই আলোচনায় কিছু উদ্ভট বৈজ্ঞানিক ধারণা ছিল। বাখ যুক্তি দেখান, কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের শারীরিক দক্ষতা শ্বেতাঙ্গ শিশুদের চেয়ে দ্রুত বিকশিত হয়, যার ফলে তাদের উন্নত মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। তিনি দাবি করেন, আফ্রিকানরা ‘দৌড়াদৌড়ি বা শিকার করা’ জীবনযাত্রার জন্য অভিযোজিত, অন্যদিকে ইউরোপীয়রা কৃষিকাজের জন্য অভিযোজিত।
এপস্টিন এই যুক্তি মেনে নেন এবং এরপর লিঙ্গবৈষম্যমূলক মন্তব্য শুরু করেন। পরে বাখ বয়স্ক বা দুর্বলদের গণমৃত্যু ভালো হতে পারে বলে মন্তব্য করেন। তিনি লেখেন, ‘মানুষ অনেক বেশি হয়ে গেছে, তাই বয়স্ক ও দুর্বলদের গণহারে মেরে ফেলা যৌক্তিক… মস্তিষ্ক যদি অব্যবহৃত নিউরন ফেলে দেয়, তবে সমাজ কেন এদের রেখে দেবে।’ এপস্টিন এতে কোনো আপত্তি জানাননি।
অবশ্য বাখ পরে এই মতবাদ থেকে সরে আসেন। নভেম্বরে তিনি বোস্টন গ্লোবকে বলেন, ‘জাতিগত পরিচয় মানসিক পার্থক্যের কারণ নয়। পরবর্তী গবেষণায় আমি বুঝেছি যে জাতিগত পরিচয় শিশুদের বা প্রাপ্তবয়স্কদের বুদ্ধিমত্তা নির্ধারণ করে না।’
এপস্টিন বিজ্ঞানের জগতে প্রবেশ করেছিলেন জন ব্রকম্যানের হাত ধরে। ব্রকম্যান ছিলেন জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখকদের এজেন্ট। ২০০৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় এক ডিনারে তাদের পরিচয় হয়। এরপর এপস্টিন বিজ্ঞানীদের অর্থায়ন করতে শুরু করেন এবং তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন। নিজের ওয়েবসাইটে তিনি গর্ব করে লিখতেন, ‘অনেক বিশিষ্ট বিজ্ঞানীকে স্পনসর করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।’
২০০৬ সালে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসের সেন্ট থমাসে এপস্টিন একটি সম্মেলনের আয়োজন করেন, যেখানে স্টিফেন হকিংও বক্তা হিসেবে ছিলেন। সম্মেলনটি মহাকর্ষ তত্ত্ব নিয়ে হলেও এক অংশগ্রহণকারী জানান, এপস্টাইন মানব জিনোম নিখুঁত করা এবং কীভাবে বংশগত বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে উন্নত মানুষ তৈরি করা যায়, তা নিয়ে আগ্রহী ছিলেন।
হার্ভার্ডের ‘প্রোগ্রাম ফর ইভোলিউশনারি ডাইনামিক্স’-এ তিনি ৬৫ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছিলেন। ২০১১ সালে তিনি ‘ওয়ার্ল্ডওয়াইড ট্রান্সহিউম্যানিস্ট অ্যাসোসিয়েশন’-এ ২০ হাজার ডলার দেন।
নতুন নথিপত্রে এপস্টিনকে এমন এক ব্যক্তি হিসেবে দেখা যায়, যিনি জিনগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণায় মগ্ন ছিলেন। একজন ইহুদি হয়েও তিনি হলোকাস্ট নিয়ে রসিকতা করতেন এবং আর্য বৈশিষ্ট্যের প্রতি মুগ্ধ ছিলেন।
ইমেইলে তিনি বারবার ‘নীল চোখের’ গুরুত্বের কথা বলেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন এটি বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ। যৌনতার জন্য আনা নারীদের মধ্যে তিনি নীল চোখ খুঁজতেন। এমনকি এক নথিতে বিজ্ঞান সম্মেলনের অংশগ্রহণকারীদের নামের পাশে তাদের চোখের রঙও লিখে রাখা ছিল।
বিনিয়োগকারী হিসেবেও এপস্টাইন ‘ডিজাইনার বেবি’ এবং জিনগতভাবে তৈরি শিশুদের নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। ডিওজে প্রকাশিত এক নথিতে তিনি অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরের সঙ্গে ক্লোনিং নিয়ে কথা বলার স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি ক্লোনিং শুরু করতে চাই… প্রিন্স অ্যান্ড্রু রেগে গিয়েছিলেন কারণ তিনি বলছিলেন, ”যদি এগুলোর বিবেক থাকে, তবে কি আপনি স্পেয়ার পার্টস বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জন্য এদের মারতে পারবেন?” তখন আমি বললাম, ”আমি মাথা ছাড়াই বানাব, তাহলে কি ভালো লাগবে?”’
২০১৮ সালে ক্রিপ্টোকারেন্সি উদ্যোক্তা ব্রায়ান বিশপের সঙ্গে ইমেইলে তিনি ‘ডিজাইনার-বেবি প্রজেক্ট’-এর অর্থায়ন নিয়ে কথা বলেন। এপস্টিন লেখেন, ‘বিনিয়োগ করতে আমার সমস্যা নেই, সমস্যা হলো যদি নেতৃত্ব দিতে গিয়ে আমি ধরা পড়ে যাই।’
তখন এপস্টিন নাবালিকাকে দিয়ে পতিতাবৃত্তির দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে দশ বছর পার করেছেন। এর পরের বছরই তার বিরুদ্ধে যৌন পাচারের অভিযোগ আনা হয় এবং এক মাস পর তিনি আত্মহত্যা করেন।
বিশপ ওই প্রকল্পে গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়ে একমত ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘শিশুদের পরিচয় গোপন রাখা দরকার… আমরা প্রকাশ্যে বলতে পারব না এরা কারা বা এদের বাবা-মা কারা। তাহলে মিডিয়া এদের আজীবন ”অদ্ভুত জীব” হিসেবে দেখাবে।’
বিশপ জানিয়েছিলেন, ৫ বছরের মধ্যে প্রথম ‘জীবন্ত জন্ম’ এবং ‘সম্ভবত মানব ক্লোন’ তৈরির দিকে এগোতে চান তিনি। তিনি বলেছিলেন, ‘পৃথিবী আর আগের মতো থাকবে না, মানব প্রজাতির ভবিষ্যৎও বদলে যাবে।’
তবে টেলিগ্রাফের প্রশ্নের জবাবে বিশপ দাবি করেন, ‘আমরা তার কাছ থেকে কখনো টাকা নিইনি এবং আমি এতে গর্বিত।’
এর আগে খবর বেরিয়েছিল যে এপস্টিন নিউ মেক্সিকোতে তার ৭ হাজার একরের খামারে নিজের ডিএনএ ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। ২০১৯ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছিল, ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে এপস্টাইন তার ‘জোড়ো’ খামারটিকে একটি বেস বা ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। সেখানে নারীদের তার শুক্রাণু দিয়ে গর্ভবতী করা হবে এবং তারা তার সন্তানের জন্ম দেবে।
কম্পিউটার বিজ্ঞানী জারন ল্যানিয়ার জানান, এপস্টাইন ক্যালিফোর্নিয়ার ‘রিপোজিটরি ফর জার্মিনাল চয়েস’ নামক স্পের্ম ব্যাংকের আদলে এই পরিকল্পনা করেছিলেন। এপস্টিন চেয়েছিলেন একসঙ্গে ২০ জন নারীকে গর্ভবতী করতে। তিনি জাঁকজমকপূর্ণ ডিনার পার্টির মাধ্যমে সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী নারীদের বাছাই করতেন বলে শোনা যায়।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের অন্যান্য সূত্র জানায়, এপস্টিন ক্রায়োনিক্স বা মৃতদেহ হিমায়িত করে ভবিষ্যতে জীবিত করার ধারণাতেও আগ্রহী ছিলেন। তিনি নিজের মাথা এবং পুরুষাঙ্গ হিমায়িত করে রাখার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন।
জোড়ো খামারে প্রজনন কেন্দ্র তৈরির বিষয়টি ডিনার পার্টির আলোচনার বাইরে এগিয়েছিল কি না, তার প্রমাণ নেই। তবে নথিপত্রগুলো নিশ্চিত করে যে এপস্টিন শুধু যৌন অপরাধীই ছিলেন না, তার মাথায় জাতি, লিঙ্গ এবং জিনগত শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে এক বিকৃত ও ভয়ংকর ধারণা বাসা বেঁধেছিল। মানবজাতিকে ‘উন্নত’ করার নেশায় তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন মানবজাতির এক কলঙ্কিত অধ্যায়।