নিউইয়র্ক ষ্টেট অ্যাসেম্বলী ডিস্ট্রিক্ট-৩৬ এর বিশেষ নির্বাচন হেরে গেলেন ‘পিপল ফাস্ট’-এর প্রার্থী বাংলাদেশী-আমেরিকান মেরী জোবাইদা, জিতলেন মেয়র জোহরান মামদানী সমর্থিত ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী ইকুয়েডোরিয়ান ডায়ানা মরেনো। নির্বাচনে অপর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন ‘কুইন্স ফর অল’-এর মিশরীয় রানা আবদেলহামিদ। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারী) এই নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। প্রাথমিক ফলাফলে নির্বাচনে বিজয়ী ডায়ানা মরেনো পেয়েছেন ৬,২০৯ ভোট অর্থাৎ ৭৪.৯% ভোট। তার অপর দুই প্রতিদ্বন্দ্বির মধ্যে রানা আবদেলহামিদ-এর প্রাপ্ত ভোট ১,৪৩৫ অর্থাৎ ১৭.৩% ভোট আর মেরী জোবাইদার প্রাপ্ত ভোট ৬৫১ অর্থাৎ ৭.৯% ভোট। খবর ইউএনএ’র।
এস্টোরিয়া ও লং আইল্যান্ড সিটি নিয়ে ডিস্ট্রিক্ট-৩৬ এর নির্বাচনী এলাকা গঠিত। মেয়র জোহরান মামদানী দায়িত্ব নেয়ার পর অ্যাসেম্বলী সদস্য হিসেবে তার এই পদটি শুণ্য হয়। যার প্রেক্ষিতে এই শুন্য পদে বিশেষ নির্বাচন হচ্ছে। নানা কারণে নির্বাচনটি পুরো কমিউনিটিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিলো। নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশী-আমেরিকান প্রার্থী ছিলেন মেরী জোবাইদা।
নির্বাচনে আগাম ভোট শুরু হয় গত ২৪ জানুয়ারী শনিবার, চলে ১ ফেব্রুয়ারী রোববার পর্যন্ত। তবে প্রাকৃতিক দূর্যোগের ফলে আগাম ভোট প্রদানের হার খুবই কম পরিলক্ষিত হয়। প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে মাঝে ২৫ ও ২৬ জানুয়ারী দুদিন আগাম ভোট গ্রহণ বন্ধ ছিলো। এই আসনে ভোটার ছিলো প্রায় ৮০ হাজার। মূল ভোটের দিন ৩ ফেব্রুয়ারী মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বিরতিহীন ভোট গ্রহণ চলে। তবে এদিনও ঠান্ডার কারণে কেন্দ্রগুলোতে ভোটারের উপস্থিতি ছিলো কম।
মেরীর নির্বাচনী শিবিরে চরম হতাশা: নির্বাচনে জয়-পরাজয় থাকবে। কিন্তু ফলাফলে এতো পার্থক্য কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেন না বা হিসাব মিলাতে পারছেন না মেরী জোবাইদার নির্বাচনী শিবির। বিজয়ী ডায়ানা মরেনো যেখানে পেয়েছেন ৬,২০৯ ভোট, সেখানে মেরী জোবাইদা পেয়েছেন মাত্র ৬৫১। এতো কম ভোট পাওয়ায় তারা চরম হতাশা ব্যক্ত করেছেন। অথচ প্রার্থী হিসেবে মেরী জোাবাইদার তিন হাজারোধীক ভোটারের সমর্থনে বোর্ড অব ইলেকশনে পিটিশন দাখিল করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই শিবিরের ধারণা ছিলো এই তিন হাজার ভোট মেরী জোবাইদার ভোট ব্যাংক হিসেবে কাজ করবে এবং আরো নতুন ভোট নিয়ে তিনি-ই জয়ী হবেন।
যে কারনে হারলেন মেরী জোবাইদা: ভোট গ্রহণ শেষে নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশ হতে না হতেই কমিউনিটিতে মেরী জোবাইদার ভরাডুবির কারণ খোঁজা শুরু হয়। বার্তা সংস্থা ইউএনএ’র প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, মূলত: নির্বাচন ঘিরে মেরী জোবাইদা শিবিরের বাংলাদেশী কমিউনিটির উপর নির্ভরতা, অন্য কমিউনিটিকে ততধিক গুরুত্ব না দেয়া, কমিউনিটির অনৈক্য, দেশীয় রাজনীতির প্রভাব ছাড়াও সিটি মেয়র জোহরান মামদানী, ডেমোক্র্যাট দলীয় আর নিউইয়র্ক সিটি ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট অব আমেরিকা (ডিএসসি)-এর সমর্থন না পাওয়া, নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের সাংগঠনিক দূর্বলতা, প্রশাসনিক ষড়যন্ত্র প্রভৃতিকেই দায়ী করা হয়েছে।
অপরদিকে মেয়র জোহরান মামদানী, ডেমোক্র্যাট দলীয় আর ডিএসসি’র সমর্থন না পাওয়ার পরেও নানা প্রতিকূলতার মধ্যে মেরী জোবাইদার প্রার্থী হওয়াকে অনেকেই সহসী উদ্যোগ আর নতুন প্রজন্মের জন্য পথ নির্দেশনা হিসেবে দেখছেন।
মেরী জোবাইদার সমর্থক এম আর চৌধুরী এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন- ‘নির্বাচনে জয়-পরাজয় থাকবেই- এই অমোঘ সত্যটি মেনে নিয়েই আমরা আমাদের যোগ্য প্রার্থী মেরী জুবাইদা’র পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছিলাম। আজ নির্বাচনের ফলাফল আমাদের পক্ষে না আসলেও, আমাদের বিমর্ষ হওয়ার বা অনুশোচনা করার কোনো কারণ নেই। কারণ, আমরা একটি আদর্শিক লড়াই লড়েছি।’
মেরী জোবাইদার ক্যাম্পেইনের অন্যতম সদস্য, বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী বলেছেন- ‘ডিস্ট্রিক্ট ৩৬ নির্বাচনে কেন আমরা হেরে গেলাম? এই প্রশ্নটি এখন সকলের মনে বার বার আসছে। আমাদের কমিউনিটির প্রায় সকল মূলধারার নেতৃবৃন্দ তার সাথে ছিলেন, এটা সঠিক কিন্তু কেন এমন হলো? কারন গুলি নির্ধারন করা জরুরী! আমাদের ভবিষ্যৎ প্রার্থীদের অথবা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কাজে লাগাতে পারে । মেরী জোবাইদা একজন সাহসী নারী! তাকে ধন্যবাদ তার সাহসী নেতৃত্বের জন্য, যতদিন বেঁচে থাকবো হারী আর জিতি আমাদের কমিউনিটির সাথে থাকবো, কখনো নিজের শিকড় কে অপমান করবো না।’
মেরী জোবাইদার ক্যাম্পেইনের অন্যতম সদস্য, টাইম টেভিশনের পরিচালক সৈয়দ ইলিয়াস খসরু বলেন- ‘এত বড় সামরাজ্যবাদের সাথে যুদ্ধ করে মেরী জোবাইদা বলেছিলো আমি সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে মাঠে থাকবো। এত সাহস করে মেরি জোবাইদা যে হেডমের পরিচয় দিয়েছে কিম্বা পুরো মাঠকে কাঁপিয়ে রেখেছিল- এটাই আমাদের বিজয়।’
লেখিকা এইচ বি রিতা তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন- ‘শুভেচ্ছা ডায়ানাকে। বাকিদেরও শুভ কামনা, হার জিত থাকবেই। ইনশাআল্লাহ! সামনে আবারো আপনারা লড়বেন। তবে এই যে আজকের হার জিতের ফলাফলে এত বিশাল পার্থক্য-এর কারণ নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। মনে রাখা অতিব জরুরি যে, কেবল বাঙালী জনগোষ্ঠীই যথেষ্ট নয় আমাদেরকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে, আমাদেরকে বৃহৎ পরিসরে ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর হয়েও কথা বলতে হবে-কাজ করতে হবে।’
মেরী জোবাইদার প্রতিক্রিয়া: নির্বাচনের পর মেরী জোবায়দার তার ফেসবুক পেইজে এক প্রতিক্রিয়ায় তার ভোটার, সমর্থক ও শুভান্যূধায়ীদের উদ্দেশ্যে বলেন- ‘আপনাদের কাছে একটাই অনুরোধ। ধরে নিন যে, এই হারটা আমি একাই হেরেছি। এটাকে আমাদের সবার জন্য চিরন্তন ধরে নিবেন না দয়া করে। এটা তো সত্যি যে আমি এই মাঠে একটা সরিষা দানা মাত্র। আমার ব্যার্থতা দিয়ে আপনারা আমাদের পুরো কমিউনিটিকে মাপবেন না। আমার মতো মানুষরা না রাজনীতি করে না নির্বাচন। আমার এই পরাজয় হোক ভবিষ্যতের অনেক জয় যাত্রার কারন।’
বিজীয় ডায়ানা’র বিজয় উৎসব: ইকুয়েডর থেকে অভিবাসী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসা ডায়ানা মোরেনো একজন পরিচিত শ্রমিক অধিকারকর্মী। তিনি বর্তমানে কুইন্সের এস্টোরিয়ায় তার সঙ্গী ও এক বছর বয়সী সন্তানের সঙ্গে বসবাস করছেন। নির্বাচনে জয়ের পর মঙ্গলবার রাতেই নিজ এলাকার জনপ্রিয় ইকুয়েডরিয়ান রেস্তোরাঁ ‘বারজোলা’-তে সমর্থকদের সঙ্গে ‘বিজয় উৎসব’ উদযাপন করেন তিনি। এসময় তিনি মেয়র জোহরান মামদানী সহ সংশ্লিস্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। খবর ইউএনএর