১লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতকে নিয়ে আশাবাদী হয়ে উঠল কেন

যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতকে নিয়ে আশাবাদী হয়ে উঠল কেন

বাঙালি আগেও প্রান্তবর্তী ছিল, এখনও সেই প্রান্তবর্তীই রয়ে গেল। একেবারে উঁচু থেকে সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত সর্বত্র ওই একই ঘটনা, একই রকমের কলহ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ছিনতাই, খুনোখুনি। পথেঘাটে ছিনতাই হয়, হবেই; রাষ্ট্রক্ষমতাও তো ছিনতাই হয়ে গেছে, একাধিকবার। এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনতাই করেছিলেন রাজনীতিকদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের সুযোগ ব্যবহার করে। এরশাদ সরকারের পতন ঘটেছে গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে। পরিণতিতে নির্বাচন পাওয়া গেছে। এরপর একাধিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাতে পুরাতন নীতির কোনো বরখেলাপ ঘটেনি, জনগণের তেমন একটা লাভ হয়নি, লাভ হয়েছে কিছু মানুষের।
কতিপয়ের শাসন দেশে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হোক কিংবা প্রতিষ্ঠা পাক জবরদখলের সাহায্যে কিংবা যে কোনো উপায়ে, তাকে স্বৈরাচার ভিন্ন অন্যকিছু বলবার উপায় নেই, উপায় থাকে না। এটা কেবল যে বাংলাদেশে ঘটছে তা নয়, ঘটছে সমগ্র পুঁজিবাদী বিশ্বে। বুর্জোয়া গণতন্ত্রের আদর্শস্থল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভোটেজয়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বেচ্ছাচারে পৃথিবীজুড়ে অশান্তি, অস্থিরতা বিরাজ করছে। কোনো রাষ্ট্রই আজ নিরাপদে নেই, ট্রাম্পের হিংস্র আগ্রাসন থেকে। বিশ্বব্যবস্থা আজ হুমকির কবলে। দেশের সম্পদ থাকাও যে দেশের জন্য হুমকি, সেটি ট্রাম্পের আগ্রাসনে প্রমাণিত হয়েছে।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থার আরেক অবদান হচ্ছে মৌলবাদ, যা এখন বেশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। খবরে প্রকাশ, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের বড় দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়তে চায় এবং তারা মনে করে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দলটি অতীতে যে সাফল্যের মুখ কখনও দেখেনি, এবার তা দেখতে পারে। এ নিয়ে ক্ষমতার প্রধান দাবিদার বিএনপি শিবিরে বেশ উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে, নাগরিক সমাজেও এ নিয়ে আলোচনা বিস্তর। কিন্তু উগ্র মৌলবাদীরা তো উৎপাদিত হয়েছে পুঁজিবাদীদেরই কারখানাতে। সমাজতন্ত্রীদের উৎখাত করার জন্য মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ পাকিস্তানের মাদ্রাসাগুলোতে যে যুবকদের লালনপালন করেছে, অর্থ দিয়েছে, সুযোগ দিয়েছে অস্ত্র ও মাদক চোরাচালানের, তারাই পরে আফগানিস্তান দখল করে নিয়ে মৌলবাদী এক ব্যবস্থা কায়েম করেছিল। তখন তাদের শত্রু ছিল সমাজতন্ত্রীরা; সমাজতন্ত্রীরা যখন মাঠে নেই, সেই শত্রুকে সামনে না পেয়ে ওই মৌলবাদীরা পরবর্তী সময়ে তাদেরই স্রষ্টা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে শত্রু করে তুলেছিল। দখলদার মার্কিনিদের হটিয়ে আফগানিস্তান বর্তমানে তালেবান রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

এই ঘটনা প্রত্যক্ষ। দৈত্য যখন কাজ না পায় তখন মনিবের ঘাড়ে হাত দেয়। দৈত্যের সব কাজই অন্যায় ক্রিয়া, অন্যায় ছাড়া সে থাকতে পারে না, পারে না বলেই এখন তাদের দৌরাত্ম্য সভ্যতাবিধ্বংসী রূপ পরিগ্রহ করেছে। পুঁজিবাদী বিশ্ব এক দৈত্যকে নিবৃত্ত তো পরের কথা, নিয়ন্ত্রিতও করতে পারছে না। দৈত্য বড়ই বেয়াড়া। কিন্তু পুঁজিবাদের সঙ্গে মৌলবাদের যে দ্বন্দ্ব সেটা গভীর নয়, মৌলবাদের গভীর ও মৌলিক দ্বন্দ্ব হচ্ছে সমাজতন্ত্রের সঙ্গে।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে মৌলবাদ এবং পুঁজিবাদের মধ্যে মিলবার কোনো জায়গা নেই। মৌলবাদ পশ্চাৎপদ, পুঁজিবাদ হচ্ছে আধুনিক। চেহারাসুরত, পোশাক-পরিচ্ছদ সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী। কিন্তু দুয়ের মধ্যে আদর্শগত ঐক্য বিদ্যমান রয়েছে এবং কেমন করে অস্বীকার করব এই সত্য যে আদর্শিক ঐক্যই হচ্ছে মূল ব্যাপার, তার বাইরে যা রয়েছে তা অমৌলিক, অনেকাংশে পোশাকি। আদর্শিক ঐক্যটা এইখানে যে, উভয় মতবাদই ব্যক্তির স্বার্থকে প্রধান করে তোলে সমষ্টির স্বার্থকে উপেক্ষা ও পদদলিত করে।

মৌলবাদীরা মোক্ষ খোঁজে। সে মোক্ষ অবশ্যই ব্যক্তিগত। তাদের ধর্মচর্চাটাকে মনে হয় অলৌকিক, আধ্যাত্মিক। আসলে সেটি পুঁজি সঞ্চয়। তাদের পুণ্য এক প্রকারের পুঁজি বটে, ব্যক্তিগত পুঁজি; এর ক্ষেত্র ইহকাল-পরকাল উভয় ভূমি পর্যন্ত প্রসারিত। তারাও মুনাফাতন্ত্রী। নিজের পুঁজি বাড়ানোর জন্য মৌলবাদীরা অন্যের ওপর অত্যাচার করে, মানুষ মারতে পর্যন্ত পিছপা হয় না, মূর্তি ভাঙতে তাদের হাত কাঁপে না। অন্ধকারকে লালন করে, অন্ধবিশ্বাসকে উত্তেজিত করে তোলে, সমষ্টিগত অগ্রগতিকে ঠেলতে থাকে পেছন দিকে। সকলকে পিছিয়ে দিয়ে নিজেরা এগোতে চায়। নিজেরা নয়, চূড়ান্ত বিচারে প্রত্যেক মৌলবাদীই ব্যক্তিগত, নিজের জন্য কাজ করছে; নিজের মুক্তি ছাড়া অন্য কিছু বোঝে না।

মৌলবাদীরা আবার ভোগবাদীও বটে, তাদের স্বর্গ ভোগের উপকরণ দিয়ে ঠাসা। পুঁজিবাদীদের স্বর্গের সঙ্গে তাদের স্বর্গের মৌলিক কোনো ব্যবধান নেই। পুঁজিবাদের আদর্শিক মুখচ্ছবি দুটি। একটি উদারনৈতিক, অপরটি ফ্যাসিবাদী; উদারনীতি অত্যন্ত ভদ্র, ফ্যাসিবাদ ভয়ংকররূপে আক্রমণাত্মক। ভেতরে তাদের আবার একই কারবার। উদারনীতি ভান করে নিরপেক্ষতার কিন্তু সংসারে নিরপেক্ষতা বলে কিছু নেই, বিশেষ করে সেই পরিস্থিতিতে, যেখানে লড়াই চলছে শুভের সঙ্গে অশুভের, ব্যক্তির স্বার্থের সঙ্গে সমষ্টিগত মঙ্গলের। এই যুদ্ধে উদারনীতি যদি বলে সে নিরপেক্ষ তাহলে বুঝতে অসুবিধা কোথায় যে আসলে সে ব্যক্তির পক্ষেই, সমষ্টির পক্ষে নয়। উদারনীতি অবাধ প্রতিযোগিতায় বিশ্বাস করে, যার অর্থ সে প্রবলের সমর্থক, দুর্বলের বিপক্ষে।

ফ্যাসিবাদও তাই; সেও প্রবলকে বিকশিত করতে চায়, দুর্বলকে লাঞ্ছিত করে। দুয়ের মধ্যে তফাত ওই ভদ্রতারই। ফ্যাসিবাদ ভদ্রতার ধার ধারে না, সে নগ্ন উন্মোচিত, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রতি তার সমর্থনটা উগ্র ও প্রত্যক্ষ, রাখঢাক করে না, উদাহরণ ট্রাম্প। ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীরাও পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকেই রক্ষা করতে চায়, তারাও ব্যক্তিস্বার্থ দেখে, সমষ্টি স্বার্থের বিপরীতে। তারাও উগ্র, তারাও ভয়ংকর।
মৌলাবাদী ও পুঁজিবাদীরা যে পরস্পরের আপনজন, সেটা পরিষ্কার হয় সমাজতন্ত্রের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা লক্ষ্য করলে। উভয়েই সমাজতন্ত্রবিরোধী। তার কারণ সমাজতন্ত্র ব্যক্তিকে বড় করে তোলে না; ব্যক্তিকে সে রক্ষা করতে চায় সমষ্টিকে বিকশিত করে। একের বোঝা সে দশের ওপর চাপায় না; বোঝাটিকে দশের সম্পত্তিতে পরিণত করে, যাতে দশজনই চলতে পারে সমান বেগে, অগ্রগতি ঘটে সকলের। পুঁজিবাদ সমাজতন্ত্রকে শত্রু মনে করে; পুঁজিবাদ চায় অল্পলোকের মঙ্গল, অন্য সকলের শোষণ ঘটিয়ে। ধর্মীয় মৌলবাদ বলে সমাজতন্ত্রকে সে ঘৃণা করে, কারণ সমাজতন্ত্র হচ্ছে বস্তুবাদী। কিন্তু মৌলবাদীরাও ভেতরে ভেতরে বস্তুবাদীই, তারাও সুখ চায়, যে সুখ বস্তুর দখলদারির ওপর নির্ভর করে, যে জন্য তালেবানরা মাদ্রাসায় থাকে না, অস্ত্র হাতে নিয়ে সিংহাসন দখলে লিপ্ত হয়। আর বিশ্বের সর্বত্রই দেখা যায়, দেখা গেছে অতীতেও যে, ধর্মীয় মৌলবাদীরা ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে পবিত্র বলে মনে করে; ধনী ধনীই থাকবে, যেমন গরিব থাকবে গরিব, তারা শুধু দেখে সকলেই তাদের প্রচারিত ধর্মের পথে আসে কিনা, নাকি বিচ্যুত হচ্ছে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দৈনিক সমকাল এর সৌজন্যে