৩১শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

মধ্যপ্রাচ্যের পথে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক বহর, এক নজরে রণসজ্জা

ইরানে বিক্ষোভ দমনের জেরে এই সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে পেন্টাগন। পাঠানো হয়েছে হাজার হাজার সৈন্যসহ একটি বিমানবাহী রণতরী বা ‘এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার গ্রুপ’। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানে চলমান পরিস্থিতির মধ্যে তিনি দেশটিতে হামলার সম্ভাবনা এখনো উড়িয়ে দিচ্ছেন না।

বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের বিশাল এক নৌবহর ওই দিকে যাচ্ছে। হয়তো আমাদের এটি ব্যবহার করতে হবে না।’ তিনি জানান, মূলত ‘সতর্কতা’ হিসেবেই এগুলো পাঠানো হচ্ছে।

ইরান যদি গণহারে বন্দি বা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে, তবে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে সম্প্রতি তিনি কিছুটা পিছু হটে দাবি করেছেন, ইরান ৮০০ বন্দির ফাঁসি স্থগিত করেছে। যদিও তিনি এই দাবির উৎসের কথা বিস্তারিত বলেননি এবং ইরানের শীর্ষ কৌঁসুলি একে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছেন।

তবে ট্রাম্প তার সব পথই খোলা রেখেছেন বলে মনে হচ্ছে। বৃহস্পতিবার ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এ তিনি বলেন, ইরান সরকার যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের এবারের সামরিক পদক্ষেপ গত বছরের ইরানের পরমাণু কেন্দ্রে চালানো হামলাকেও হার মানাবে। তিনি বলেন, এবারের হামলার কাছে গতবারের হামলাকে ‘খুবই সামান্য’ মনে হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের পথে বিমানবাহী রণতরী : মার্কিন নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ এবং এর সঙ্গে থাকা তিনটি ডেস্ট্রয়ার দক্ষিণ চীন সাগর ছেড়ে পশ্চিম দিকে রওনা দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা জানান, শুক্রবার এই ‘লিংকন স্ট্রাইক গ্রুপ’টি ভারত মহাসাগরে অবস্থান করছিল।

ওই অঞ্চলে পৌঁছানোর পর যুদ্ধজাহাজগুলো বাহরাইন বন্দরে থাকা তিনটি ‘লিটোরাল কমব্যাট শিপ’ এবং পারস্য উপসাগরে থাকা মার্কিন নৌবাহিনীর আরও দুটি ডেস্ট্রয়ারের সঙ্গে যোগ দেবে।

এই ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপটি পৌঁছালে ওই অঞ্চলে প্রায় ৫ হাজার ৭০০ জন বাড়তি সেনা যুক্ত হবে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি ঘাঁটি রয়েছে। এর মধ্যে কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি অন্যতম, যেখানে হাজার হাজার মার্কিন সেনা থাকে এবং এটি ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের ফরোয়ার্ড হেডকোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ওপর চাপ বাড়াতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে কিছু সম্পদ সরিয়ে ক্যারিবীয় সাগরে নিয়েছিল। এখন আবার বিমানবাহী রণতরী মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হচ্ছে।

গত অক্টোবরে বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’-কে ভূমধ্যসাগর থেকে ক্যারিবীয় অঞ্চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সে সময় বেশ কিছু ডেস্ট্রয়ারও সাথে ছিল। এ ছাড়া ‘ইউএসএস নিমিৎজ’, যা জুনে ইরানের পরমাণু কেন্দ্রে হামলায় সহায়তা করেছিল, সেটিও অক্টোবরে ওই অঞ্চল ছেড়েছিল।

আরও যুদ্ধবিমান পাঠানো হচ্ছে : সেন্ট্রাল কমান্ড সোশ্যাল মিডিয়ায় জানিয়েছে, বিমানবাহিনীর এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল যুদ্ধবিমান এখন মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন আছে। তারা উল্লেখ করে, এই যুদ্ধবিমান ‘যুদ্ধের প্রস্তুতি বাড়ায় এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে’।

একইভাবে, যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) জানিয়েছে যে, তারা কাতারে তাদের টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে, যা ‘প্রতিরক্ষামূলক ক্ষমতা’ হিসেবে কাজ করবে। ফ্লাইট ট্র্যাকিং ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ডজনখানেক সামরিক কার্গো বিমানও ওই অঞ্চলের দিকে যাচ্ছে।

এই তৎপরতা গত বছরের মতোই। তখন তিনটি প্রধান পরমাণু কেন্দ্রে বোমা হামলার পর ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেমসহ আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাঠিয়েছিল। হামলার কয়েক দিন পরই ইরান আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ডজনখানেক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল।

ইরানে কী ঘটছে : ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে ইরানজুড়ে বিক্ষোভ ও আন্দোলন চলছে। দেশটির রুগ্ন অর্থনীতির কারণেই এই বিক্ষোভের সূত্রপাত। এই আন্দোলন ইরান পরিচালনাকারী ধর্মতাত্ত্বিক সরকারের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। জবাবে সরকার কঠোর হাতে দমন-পীড়ন চালাচ্ছে এবং ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে।

কর্মীরা বলছেন, দমন-পীড়নে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৫ হাজার ৩২ জনে দাঁড়িয়েছে। ব্যাপক ধরপাকড় অভিযানে ২৭ হাজার ৬০০ জনেরও বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। তবে ইরানের সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা অনেক কম—মাত্র ৩ হাজার ১১৭ জন।

ইরানি কর্মকর্তারা গত সপ্তাহে ইঙ্গিত দিয়েছেন, বিক্ষোভে আটক সন্দেহভাজনদের দ্রুত বিচার ও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল হস্তক্ষেপ করলে ‘চূড়ান্ত জবাব’ দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন তারা।