৩১শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র

ট্রাম্পের ইচ্ছা পূরণ হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ভূখণ্ড অধিগ্রহণ হবে গ্রিনল্যান্ড

ট্রাম্পের ইচ্ছা পূরণ হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ভূখণ্ড অধিগ্রহণ হবে গ্রিনল্যান্ড

যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ ডেভিড সিলবি এক ইমেইলে লিখেছেন, “ট্রাম্প একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী, এত বিশাল পরিমাণ জমি দখলের ধারণাটাই সম্ভবত তাঁর প্রধান প্রেরণা: (মার্কিন) ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি জমি।” উনিশ শতকে নবীন দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত বিস্তৃত হয়েছিল।

প্রথম বড় পদক্ষেপটি আসে ১৮০৩ সালে লুইজিয়ানা পারচেজ নামক বিপুল ভূখণ্ড ক্রয়ের মাধ্যমে। সে সময় প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন ফ্রান্সের কাছ থেকে বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিম, পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের বিশাল একটি অংশ কিনে নেন।

এরপর ১৮৪৮ সালে ঘটে মেক্সিকান সেশন। মেক্সিকো-আমেরিকা যুদ্ধের পর শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে মেক্সিকো বর্তমান ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাদা ও আরও কয়েকটি রাজ্যসহ বড় একটি ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়।

এরপর ১৮৬৭ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে আলাস্কা কেনে যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় এই অঞ্চলকে ‘বরফের বাক্স’ বলে উপহাস করা হয়েছিল এবং অনেকেই একে অপ্রয়োজনীয় ও ব্যয়বহুল মনে করেছিলেন।

কিন্তু, বর্তমান রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি তাঁর ইচ্ছামতো এগোতে পারেন এবং গ্রিনল্যান্ডবাসী অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেকোনো পন্থায় গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেন, তাহলে সেটি অতীতের এসব অধিগ্রহণকেও ছাড়িয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল আর্কাইভস, পুরিসংখ্যান দপ্তর ও সিআইএ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুকের তথ্য অনুযায়ী, ৮ লাখ ৩৬ হাজার বর্গমাইল আয়তনের গ্রিনল্যান্ড ফ্রান্স, ব্রিটেন, স্পেন, ইতালি ও জার্মানির সম্মিলিত আয়তনের চেয়েও বড়। যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ করে, তাহলে সেটিই হবে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ভূখণ্ড সংযোজন।

ডেনমার্কের রাজ্যের অংশ হিসেবে ৩০০ বছরের বেশি সময় ধরে থাকা গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে ট্রাম্পের আগ্রহের পেছনে তিনি “জাতীয় নিরাপত্তা”র যুক্তি তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যে রাশিয়া ও চীনের হুমকির প্রসঙ্গ এসেছে। তবে অতীতে গ্রিনল্যান্ডের বিশাল আয়তন নিয়েও তিনি মন্তব্য করেছেন, আর গবেষকদের মতে, এই ভৌগোলিক বিশালত্বই তাঁর কাছে আকর্ষণের একটি বড় কারণ।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ ডেভিড সিলবি এক ইমেইলে লিখেছেন, “ট্রাম্প একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী, এত বিশাল পরিমাণ জমি দখলের ধারণাটাই সম্ভবত তাঁর প্রধান প্রেরণা: (মার্কিন) ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি জমি।” তিনি আরও বলেন, “ট্রাম্প সাধারণত এমন লক্ষ্যবস্তু বেছে নিতে পছন্দ করেন, যারা পাল্টা লড়াই করার মতো শক্তিশালী নয়—ডেনমার্কের ক্ষেত্রেও এটাই প্রযোজ্য।”

এই সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় বসছেন। তবে ডেনিশ ও গ্রিনল্যান্ডিক উভয় পক্ষই স্পষ্ট করে জানিয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই দ্বীপ বিক্রির জন্য নয়। তবু এতেও এখন পর্যন্ত ট্রাম্প ও তাঁর টিম নিরুৎসাহিত হননি।

গত সপ্তাহে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, গ্রিনল্যান্ডের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে ভালো সমাধান হবে এর মালিকানা নিয়ে নেওয়া, কারণ মালিকানা “সাফল্যের জন্য মানসিকভাবে প্রয়োজনীয়”। সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, “আমি সহজ পথে চুক্তি করতে চাই। কিন্তু যদি সহজ পথে না হয়, তাহলে কঠিন পথেই করতে হবে।”

গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত সামরিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা দীর্ঘদিনের মার্কিন-ডেনিশ প্রতিরক্ষা চুক্তির গুরুত্বও ট্রাম্প খাটো করে দেখিয়েছেন। চুক্তির সুবাদেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও স্নায়ুযুদ্ধের সময় দ্বীপটিতে যুক্তরাষ্ট্রের হাজারো সেনা ও এক ডজনের বেশি সামরিক ঘাঁটি ছিল; যদিও বর্তমানে সেখানে মাত্র একটি ঘাঁটি রয়েছে।

নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ ড্যানিয়েল ইমারওয়ার বলেন, সাম্প্রতিক কোনো প্রেসিডেন্টের চেয়ে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা সম্প্রসারণে বেশি আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। তিনি পানামা খাল পুনর্দখলের বিষয়ে ট্রাম্পের জোরালো অবস্থান, কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর মন্তব্য, গত বছর গাজা দখলের কথা বলা এবং গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তাঁর একাগ্র আগ্রহের কথা উল্লেখ করেন।

ইমারওয়ার বলেন, “স্পষ্টতই ট্রাম্প ভূখণ্ড সংযুক্তির দিকে ঝুঁকছেন, যা সাম্প্রতিক কয়েক দশকের কোনো (মার্কিন) প্রেসিডেন্টের মধ্যে দেখা যায়নি। এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা অনেকটা অতীতের প্রেসিডেন্টদের—পোল্ক বা থিওডোর রুজভেল্টের—মতো, তবে ১৯৪৫-পরবর্তী সময়ে এমন নজির নেই।”

গ্রিনল্যান্ডের আয়তন যে সত্যিই ট্রাম্পের চিন্তায় বড় ভূমিকা রেখেছে, তার উল্লেখ রয়েছে ‘দ্য ডিভাইডার’ বইয়ে। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের হোয়াইট হাউস প্রতিবেদক পিটার বেকার ও নিউ ইয়র্কারের লেখক সুসান গ্লাসার ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদ নিয়ে লেখা এই বইয়ে বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

বইটির জন্য দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আমি মানচিত্র ভালোবাসি। আর আমি সব সময় বলেছি, ‘এর আয়তনটা দেখো। এটা বিশাল। এটা যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়া উচিত।'” ১৮৬৭ ও ১৯৪৬ সালেও মার্কিন কর্মকর্তারা গ্রিনল্যান্ড কেনার ধারণা সামনে এনেছিলেন, কিন্তু তা কখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

এদিকে গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দারা পুরো ধারণাটিকেই অপমানজনক বলে মনে করেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ডের ৫৭ হাজার বাসিন্দার প্রত্যেককে ১০ লাখ ডলার করে দেওয়ার প্রস্তাবও দেয়, তবুও তারা তা গ্রহণ করবে না বলে জানিয়েছেন গ্রিনল্যান্ডের পার্লামেন্টের সাবেক সদস্য আক্কালুক লিংগে।

তিনি বলেন, “আমরা আমাদের আত্মা বিক্রি করি না।”