যেসব বাংলাদেশিরা আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন দেখছেন, তাদের জন্য দুঃসংবাদ দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসন ভিসা (ইমিগ্র্যান্ট ভিসা) প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি নথিতে এ বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে ।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ নীতির অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে তা কার্যকর হবে বলে জানা গেছে। ফলে বাংলাদেশের যেসব নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে থাকতে গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করেছেন বা করতে যাচ্ছেন, তাদের জন্য বিপদ বাড়ল।
অভিবাসন ভিসার প্রক্রিয়া স্থগিতের বিষয়টা কী? কেন এমন সিদ্ধান্ত নিল মার্কিন প্রশাসন? বাংলাদেশি আবেদনকারীরা এর ফলে কতটা সমস্যায় পড়তে পারেন—চলুন জেনে নেই। অভিবাসন ভিসার প্রক্রিয়া স্থগিতের বিষয়টা কী?
যুক্তরাষ্ট্রে অন্য দেশের নাগরিকদের স্থায়ীভাবে বসবাস ও কাজ করার অনুমতি দিতে দেশটির সরকার ইমিগ্র্যান্ট (অভিবাসন) ভিসা দেয়। এর আওতায় আছে গ্রিন কার্ড, ফ্যামিলি-স্পন্সরড ভিসা, এমপ্লয়মেন্ট-বেসড ভিসা বা ডাইভার্সিটি লটারি (ডিভি) ভিসা।
পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট এক বিবৃতিতে বলেন, ‘৭৫টি দেশ থেকে অভিবাসন স্থগিত রাখা হচ্ছে। পররাষ্ট্র দপ্তর অভিবাসন প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়ন করবে যেন সুবিধা নেওয়া বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ রোধ করা যায়।’
তবে এটি শুধু ইমিগ্র্যান্ট ভিসার জন্য। নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা, যেমন—ভ্রমণ ভিসা (বি-ওয়ান), ব্যবসায়িক ভিসা (বি-টু), শিক্ষার্থী ভিসা (এফ-ওয়ান) বা ওয়ার্ক ভিসা (এইচ-ওয়ানবি) এতে প্রভাবিত হবে না। কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং কতদিনের জন্য?
এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৯ সালের পুরোনো অভিবাসন আইনের ‘পাবলিক চার্জ’ নীতির নিরীক্ষা ও প্রয়োজনে সংস্কার। সহজ কথায়, আবেদনকারীরা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সুযোগ-সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন কি না, তা যাচাই করার প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র চায় না যে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা নিজেদের আর্থিক সক্ষমতা না বাড়িয়ে সরকারি সহায়তার (ওয়েলফেয়ার, পাবলিক বেনিফিটস) দিকে ঝুঁকে পড়ুক। তারা আমেরিকান করদাতাদের ওপর যেন বোঝা না হয়। অভিবাসীরা যেন নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে দেশটিতে প্রবেশ করেন, তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ।
এই ৭৫ দেশের নাগরিকদের মধ্যে অনেকেরই আর্থিক স্বনির্ভরতার অভাব, স্বাস্থ্যগত সমস্যা বা বেশি বয়স, অতিরিক্ত ওজন, ইংরেজিতে কম দক্ষতা এবং অতীতে সরকারি সহায়তা নেওয়ার ইতিহাস রয়েছে। এখন থেকে এসব বিষয় কঠোরভাবে পর্যালোচনা করতেই এই স্থগিতাদেশ।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট বলেছেন, ‘আমরা এমন অভিবাসীদের অযোগ্য ঘোষণা করব যারা আমেরিকান জনগণের উদারতার সুযোগ নিয়ে পাবলিক চার্জ হয়ে উঠতে পারেন।’
তবে এটি অনির্দিষ্টকালের স্থগিতাদেশ। ২১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে এটি কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত পরারাষ্ট্র দপ্তর তাদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করবে, ততক্ষণ এই স্থগিতাদেশ বহাল থাকতে পারে।
বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য প্রভাব কী? বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর হাজারো মানুষ ইমিগ্র্যান্ট ভিসা নিয়ে আমেরিকায় যান। এই সিদ্ধান্তের ফলে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হবেন।
বিশেষ করে ফ্যামিলি রিইউনিয়ন বা ডাইভার্সিটি ভিসা লটারির মাধ্যমে ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। মানে যারা ভাই-বোন, বাবা-মা বা স্বামী-স্ত্রীর মাধ্যমে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষায় আছেন, তাদের ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হবে।
ওয়ার্ক ভিসা বা যারা চাকরির মাধ্যমে স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যেতে চাচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রেও এই স্থবিরতা প্রযোজ্য হবে। অনেক ক্ষেত্রে ভিসা সাক্ষাৎকার হলেও চূড়ান্ত ভিসা ইস্যু না-ও করা হতে পারে।
যারা ইতোমধ্যে ইউএসসিআইএস (ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস) থেকে অনুমোদন পেয়েছেন, কিন্তু কনস্যুলেটে প্রক্রিয়া চলছে, তাদের ভিসাও আপাতত ইস্যু হবে না। এতে অপেক্ষার সময় আরও বাড়বে।
বাংলাদেশের মতো দেশ থেকে আসা মানুষদের মধ্যে অনেকেই স্বল্প আয়ের বা স্বল্পশিক্ষিত, যাদের ‘পাবলিক চার্জ’ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। ফলে তাদের আবেদন আরও কঠিন হবে। তবে কারও দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে (অন্য দেশের পাসপোর্ট দিয়ে আবেদন), তারা ছাড় পেতে পারেন। এছাড়া, বর্তমান গ্রিন কার্ডধারীদের কোনো সমস্যা নেই। যারা যেতে চান, তাদের এখন কী করা উচিত? বর্তমান পরিস্থিতিতে যারা যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তারা কিছু বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখবেন।
এটি যেহেতু একটি নীতিগত পরিবর্তন, তাই সিদ্ধান্ত না বদলানো পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া বিকল্প নেই। নিয়মিত মার্কিন দূতাবাস ও পররাষ্ট্র দপ্তরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট এবং নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম অনুসরণ করুন।
যদি আপনার উদ্দেশ্য হয় পড়াশোনা বা জরুরি ভ্রমণ, তবে আপনি শিক্ষার্থী বা ভ্রমণ ভিসার জন্য চেষ্টা করতে পারেন। কারণ এগুলো এই স্থগিতাদেশের আওতাভুক্ত নয়।
যেহেতু ‘পাবলিক চার্জ’ বা আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে কড়াকড়ি হচ্ছে, তাই আপনার আর্থিক সক্ষমতা প্রমাণের কাগজপত্র, যেমন—স্পন্সরশিপের প্রমাণ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট আরও নিখুঁত করার দিকে নজর দিন।
আপনার কোনো ফাইল যদি প্রসেসিংয়ে থাকে, তবে একজন অভিজ্ঞ অভিবাসন আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে পারেন।