প্রকাশিত নথিগুলোর বহু অংশ জনস্বার্থ বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার কারণে কালো কালি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। তবে সেসব নথিতে ডেমোক্র্যাট সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য থাকলেও, রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম খুব কমই দেখা গেছে।
যৌন অপরাধের দায়ে দণ্ডিত প্রয়াত মার্কিন ধনকুবের জেফরি এপস্টিনকে ঘিরে কয়েক হাজার পৃষ্ঠার নতুন ফাইল (নথি) প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ। শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) প্রকাশিত এসব নথিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের নাম বারবার উঠে এলেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের উল্লেখ প্রায় নেই বললেই চলে।
প্রকাশিত নথিগুলোর বহু অংশ জনস্বার্থ বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার কারণে কালো কালি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। তবে সেসব নথিতে ডেমোক্র্যাট বিল ক্লিনটন সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য থাকলেও, রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম খুব কমই দেখা গেছে।
নতুন প্রকাশিত নথিতে ট্রাম্পের নাম না থাকায় অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। কারণ এর আগে এপস্টিন সংক্রান্ত বিভিন্ন ছবি ও নথিতে ট্রাম্পের নাম প্রায়ই সামনে এসেছে। এমনকি গত ফেব্রুয়ারিতে বিচার বিভাগ যখন এপস্টিনের ব্যক্তিগত বিমানের যাত্রী তালিকা প্রকাশ করে, সেখানেও ট্রাম্পের নাম ছিল। সে তুলনায় এবারের নথিতে তাঁর অনুপস্থিতি বিশেষভাবে চোখে পড়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই হাই-প্রোফাইল মামলার নতুন তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মূলত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে জেফরি এপস্টিনের সম্পর্কের ধরন ও বিস্তার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতেই এসব নথি প্রকাশ করা হয়েছে।
মার্কিন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ জানিয়েছেন, তারা এপস্টিনের প্রায় ১,২০০ জন ভুক্তভোগী বা তাদের স্বজনদের শনাক্ত করেছেন। তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নথির বেশ কিছু অংশ আড়াল করে রাখা হয়েছে।
প্রকাশিত নথিগুলোতে এপস্টিনের বিলাসবহুল বাড়ির অভ্যন্তরের দৃশ্য এবং তার বিভিন্ন বিদেশ সফরের বহু ছবি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব ছবিতে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, মিক জ্যাগার, মাইকেল জ্যাকসন, ডায়ানা রস ও প্রিন্স অ্যান্ড্রুর মতো বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিদের দেখা যায়। তবে নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ছবিতে কারও উপস্থিতি মানেই তিনি কোনো অপরাধে জড়িত—এমনটি প্রমাণ করে না।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নতুন প্রকাশিত নথিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম ও ছবি খুব একটা পাওয়া যায়নি। নব্বইয়ের দশক এবং ২০০০ সালের শুরুর দিকে ট্রাম্প ও এপস্টিনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব থাকলেও পরবর্তী সময়ে তাদের সম্পর্ক ভেঙে যায়। ট্রাম্পও কোনো ধরনের অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তবে ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ না করে প্রশাসন কার্যত ট্রাম্পকে আড়াল করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য টমাস ম্যাসি নথি প্রকাশের প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ জানিয়ে বলেন, এটি আইনের যথাযথ প্রতিফলন নয়। যদিও হোয়াইট হাউসের দাবি, তারা সব সময়ই স্বচ্ছতা বজায় রেখেছে।
নথি প্রকাশের পর আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন এপস্টিনের বিরুদ্ধে অন্যতম প্রথম অভিযোগকারী মারিয়া ফারমার। ১৯৯৬ সালে এফবিআইয়ের কাছে করা তার একটি অভিযোগও এই নথিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, এপস্টিন তাঁর ১২ ও ১৬ বছর বয়সী ছোট বোনদের ব্যক্তিগত ছবি চুরি করেছিলেন এবং বিষয়টি প্রকাশ করলে ঘর পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।
দীর্ঘ ২৮ বছর পর নিজের অভিযোগের স্বীকৃতি পেয়ে ফারমার বলেন, ‘আমাকে বিশ্বাস করার জন্য ধন্যবাদ। আজ আমার জীবনের অন্যতম সেরা দিন। আমি স্বস্তি অনুভব করছি, তবে আমার কান্না পাচ্ছে সেই সব মেয়েদের জন্য, যাদের এফবিআই সময়মতো রক্ষা করতে পারেনি।’
‘এটি বিল ক্লিনটনকে নিয়ে নয়’ : ক্লিনটনের ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ অ্যাঞ্জেল উরেনা এক বিবৃতিতে বলেছেন, হোয়াইট হাউস নিজেদের ওপর থেকে তদন্তের নজর সরাতেই সাবেক প্রেসিডেন্টকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তিনি বলেন, ‘তারা চাইলে ২০ বছরের পুরনো ঘোলাটে ছবি প্রকাশ করতে পারে, কিন্তু এই পুরো বিষয়টি বিল ক্লিনটনকে নিয়ে নয়।’
গত মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিচার বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ক্লিনটন ও এপস্টিনের সম্পর্ক তদন্ত করতে। সমালোচকদের মতে, ট্রাম্পের নিজের সাথে এপস্টিনের যে সম্পর্ক ছিল, তা থেকে মানুষের নজর ঘোরাতেই তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। শুক্রবার প্রকাশিত ছবিগুলোতে ক্লিনটনকে একটি সুইমিং পুল ও হট টাবে কিছু মানুষের সাথে দেখা গেছে, যাদের মুখ কালো কালি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। ক্লিনটন অবশ্য আগেই এপস্টিনের সাথে মেলামেশার জন্য অনুতাপ প্রকাশ করেছেন এবং কোনো অপরাধে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ কংগ্রেসকে জানিয়েছেন, ১,২০০ জনের বেশি ভুক্তভোগী ও তাদের আত্মীয়দের নাম নিরাপত্তার খাতিরে গোপন রাখা হয়েছে। এদিকে ডেমোক্র্যাট এবং কিছু রিপাবলিকান নেতা এই নথি প্রকাশের সমালোচনা করেছেন। ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার বলেন, প্রকাশিত নথিগুলো আসল প্রমাণের সামান্য অংশ মাত্র। রিপাবলিকান টমাস ম্যাসি বলেন, এই নথি প্রকাশ আইন অনুযায়ী হয়নি।
ট্রাম্প ভোটাররা হতাশ : অনেক ট্রাম্প সমর্থক অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন এপস্টিনের সাথে প্রভাবশালীদের সম্পর্ক এবং জেলে তার মৃত্যুর রহস্য ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, সাধারণ রিপাবলিকানদের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ৮২ শতাংশ হলেও, এপস্টিন ইস্যুতে তার ভূমিকা নিয়ে মাত্র ৪৪ শতাংশ মানুষ সন্তুষ্ট। এটি ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
গত মাসে ডেমোক্র্যাটরা কিছু ইমেইল প্রকাশ করেছিল যেখানে দাবি করা হয়, ট্রাম্প এপস্টাইনের মেয়েদের সম্পর্কে জানতেন। ট্রাম্প একে গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা কিছু ইমেইল দেখিয়ে বলেছে, ট্রাম্প এপস্টিনের বাড়িতে অনেকবার গেলেও কোনো অনৈতিক কাজে জড়াননি। এছাড়া জানা গেছে, ২০০৮ সালে দণ্ডিত হওয়ার পরও স্টিভ ব্যানন, ল্যারি সামার্স এবং প্রিন্স অ্যান্ড্রুর মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে এপস্টিনের যোগাযোগ ছিল।
এদিকে, ২০২৩ সালে জেপি মরগান ব্যাংক এপস্তিনের ভুক্তভোগীদের ২৯০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। কারণ, এপস্টাইন অপরাধী জানার পরও ব্যাংকটি পাঁচ বছর ধরে তাকে গ্রাহক হিসেবে রেখেছিল।