১লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের মেডিকেয়ার প্রতারণার নায়িকা শারমিন

নজরুল ইসলাম মিন্টু: পাহাড়ি গিরিপথ আর কমলালেবু খেতের মাঝখানে আলাবামার এক শহরে সূর্য অস্ত যাচ্ছিল। লাল-কমলা আকাশে মিশে যাচ্ছিল দূরের ছায়াপথগুলো, আর ছোট্ট ফেডারেল কারাগারের প্রাচীরে জ্বলছিল এক নিস্প্রভ সোলার ল্যাম্প। ভিতরে, এক সেলে এক মহিলা বসে ছিলেন একটি খোলা বইয়ের পাশে। নাম তার শারমিন আহমেদ। বয়স চল্লিশের কোঠায়। চোখে ক্লান্তি, কিন্তু ঠোঁটে এক বিস্ময়কর নির্লিপ্ততা।
বইয়ের পাতায় যা লেখা ছিল, তা কেবল সাহিত্যিক কল্পনা নয়। তা ছিল তাঁর নিজের জীবনকথার এক অধ্যায়। সেই অধ্যায়, যার শুরু হয়েছিল মিশিগানের ডিয়ারবর্নে এক হেলথ কেয়ার ক্লিনিক দিয়ে, আর শেষ হয়েছিল কারাগারে। এই গল্পে ছিল মেডিকেল সেবার নামে মিলিয়ন মিলিয়নড লারের প্রতারণা, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ডাক্তারদের স্বাক্ষর জাল করা এবং একাধিক মানুষের জীবন তছনছ করে দেওয়ার নির্মম কৌশল।
এই গল্প আমেরিকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাদা চাদরের নিচে লুকিয়ে থাকা কালো ছায়ার প্রতিচ্ছবি। যেখানে শারমিন শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি এক সিস্টেমের প্রতীক। এক অভিবাসী নারীর স্বপ্ন ও নীতিহীন সাফল্যের বিষাক্ত রূপকথা।
ডেট্রয়েট শহরের প্রান্তে, ডিয়ারবর্ন এলাকায় ২০১০ সালে যাত্রা শুরু করে একটি ছোট্ট ক্লিনিক All American Medical Care। নাম শুনলেই মনে হতো, যেন এটি আমেরিকার হৃদয়ে গড়ে ওঠা এক সেবাপরায়ণ প্রতিষ্ঠান। সাইনবোর্ডে বড় করে লেখা ছিল, “We care for your family.” অথচ ভিতরের গল্পটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
শারমিন আহমেদ ছিলেন এই ক্লিনিকের মালিক ও প্রধান সংগঠক। তিনি ছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত, আমেরিকার নাগরিক। জীবনে অনেক লড়াই করে তিনি এখানে পৌঁছেছিলেন। কাগজে-কলমে এই প্রতিষ্ঠানে হোম হেলথ কেয়ার সেবা, নার্সিং, ডায়াগনস্টিক টেস্ট এবং সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা সেবা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে, সেটি ছিল এক লাবণ্যময় প্রতারণার কারখানা।
তিনি গড়ে তোলেন একটি দক্ষ অসৎ কর্মীবাহিনী। কয়েকজন লাইসেন্সধারী ডাক্তার, যাদের অধিকাংশই কখনো ক্লিনিকে আসতেন না। ১২ জন ভ্রাম্যমাণ নার্স, যাদের কাজ ছিল ফাঁকা ঘরে রোগী খুঁজে বের করা। আর ছিলেন ৩ জন চতুর বিলিং ম্যানেজার, যারা জানতেন কোন কোডে কোন দাবির পেছনে কত টাকা পাওয়া যায়।
২০১৩ সাল থেকে শুরু হয় অপারেশন। মেডিকেয়ার ও মেডিকেডের রেজিস্ট্রিতে একটি চমকপ্রদ অগ্রগতি দেখা যায়। শুধু এই এক ক্লিনিক থেকেই প্রতি মাসে আসছে লাখ লাখ ডলারের বিল। রোগীরা ছিলেন অধিকাংশ বয়স্ক, অভিবাসী, কখনো কখনো তারা জানতেনও না যে তারা কোনো হেলথ কেয়ার নিচ্ছেন।
শারমিনের অফিসে প্রতিদিন তৈরি হতো একেকটি নাট্যাংশ। মেডিকেল রিপোর্ট বানানো হতো কম্পিউটারে, সাইন দেওয়া হতো ড. ডেভিড উইলিয়ামসের নামে, যিনি তখন শহরের অন্য প্রান্তে গলফ খেলছিলেন। নার্স মেরি জোহনসনের নাম ব্যবহার করে জমা দেওয়া হতো শত শত রোগীর রিপোর্ট, অথচ তিনি জীবনে একবারও শারমিনের ক্লিনিকে পা রাখেননি। এক ইমেইলে শারমিন লিখেছিলেন তার বিলিং ম্যানেজারকে, “We need more signatures. This week, 300 patients must go.”

হিসাবটা ছিল এরকম:
• প্রতি রোগী: $১২০০
• ডাক্তারকে কিকব্যাক: $২০০
• নার্স কমিশন: $১৫০
• ক্লিনিক লাভ: $৮৫০

এই কৌশলে মাত্র চার বছরেই (২০১৩ থেকে ২০১৭) তোলা হয় $২.৩ মিলিয়ন ডলার।
২০১৭ সালে U.S. Department of Health & Human Services (HHS) ও Office of Inspector General (OIG) তাদের ডেটা অ্যানালাইটিক্স টুলে পায় এক লাল সংকেত: “Unusual frequency of home visits and repeat diagnostics from a single Detroit clinic.”
FBI তখন নিযুক্ত করে এক গোপন এজেন্ট, যার ছদ্মনাম ছিল “Mr. Salim”। মাথায় হ্যাট, হাতে ভাঁজ করা প্রেসক্রিপশন—একজন রোগী সেজে ঢুকে পড়েন একজন গোয়েন্দা। নার্সরা তাকে বলেন, “Don’t worry. You’ll get the money for gas too. Just sign here.” তিনি সই করলেন, কিন্তু চিকিৎসা নয়, পেলেন কেবল চায়ের কাপ ও এক বোতল পানির অফার।
এই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় এক ভয়ঙ্কর অনুসন্ধান। সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে ২০১৯ সালে তল্লাশি চালানো হয় শারমিনের বাসা, অফিস এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। উদ্ধার হয় ৫০০টি নকল মেডিকেল রিপোর্ট, ১২টি জাল স্বাক্ষরের স্ট্যাম্প মেশিন এবং ১৫ লাখ ডলারের সমমূল্যের গয়না ও নগদ অর্থ।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে শারমিন আহমেদ ফেডারেল আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ান। তার মুখে ছিল অনুশোচনার ছায়া, কিন্তু চোখে স্পষ্ট এক অন্তর্নিহিত হিসেব।
প্রথম দিনের শুনানিতে প্রসিকিউটর তুলে ধরেন একাধিক অকাট্য প্রমাণ:
• ইমেইল চেইন, যেখানে লেখা: “We will edit the diagnosis. Keep it high—Medicare pays more for severity.”
• অডিও রেকর্ডিং, যেখানে শোনা যায় শারমিন এফবিআই-এর গোপন এজেন্টকে বলছেন: “Doctors send patients. We make the bills. Nobody checks—this is America!”
• ফিনান্সিয়াল রেকর্ড, যেখানে দেখা যায় ক্লিনিক থেকে অর্থ ধীরে ধীরে ঢুকেছে তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে, সেখান থেকে গেছে গাড়ি, জুয়েলারি, এবং মিশিগানে একটি দোতলা বাড়ির পেমেন্টে।
তাকে প্রস্তাব দেওয়া হয় plea deal; যদি তিনি তার সহযোগীদের নাম বলেন, তবে সাজা হ্রাস পাবে। শারমিন রাজি হন। আদালতের হলরুমে দাঁড়িয়ে বলেন, “আমি ভুল করেছি। তবে আমি একা ছিলাম না।” তার স্বীকারোক্তির ফলে কিছু সহযোগী, যেমন—ড. রবার্ট ক্লার্ক এবং বিলিং ম্যানেজার লিসা মার্টিনেজকেও গ্রেফতার করা হয়।
শারমিন আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন ২০০২ সালে। প্রথমে ছিলেন টেক্সাসে। বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর একা মেয়ে নিয়ে চলে আসেন ডেট্রয়েট। এখানে তিনি একটি নার্সিং হোমে কাজ শুরু করেন। দক্ষতা ছিল, আত্মবিশ্বাসও ছিল অগাধ।
তবে আমেরিকার স্বপ্ন বড্ড ব্যয়বহুল। নিজের নামে একটি প্রতিষ্ঠান খুলে যখন সমাজে একজন সফল অভিবাসী নারী হিসেবে পরিচিত হচ্ছিলেন, তখনই লোভ নামক অসুখটি গ্রাস করে তার বিবেক।
স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটিতে তিনি ছিলেন পরিচিত মুখ। নানান অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতেন। তাই যখন তার গ্রেফতার ও দোষস্বীকারের খবর ছড়িয়ে পড়ে, তখন অনেকেই হতবাক হন।
২০২১ সালের অক্টোবরে রায় ঘোষিত হয়। পাঁচ বছরের জেল, আড়াই মিলিয়ন ডলার জরিমানা এবং ২.৩ মিলিয়ন ডলার রেস্টিটিউশন আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়। সঙ্গে ক্লিনিকের লাইসেন্স বাতিল এবং সব ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়।
বর্তমানে শারমিন (বন্দী নম্বর ৬৮৭৫৪-০৩৯) আলাবামার ফেডারেল কারেকশনাল ইনস্টিটিউশনে সাজা ভোগ করছেন। তিনি এখন অপেক্ষা করছেন মুক্তির। ২০২৬ সালের মার্চে তার মুক্তির সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারিত হয়েছে।
ডেট্রয়েটের শীতল বাতাসে এখনো কেউ কেউ স্মরণ করেন “শারমিন আপা”-কে। কেউ তার কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন, কেউ চিকিৎসার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। আবার কেউ মনে রাখেন তাকে “ফেক সেবা দাতা” হিসেবে।
শারমিন হয়তো একদিন মুক্ত হবেন, নতুন জীবন শুরু করবেন। কিন্তু সেই জীবনের ভেতরেও থেকে যাবে একটি ছায়া, একটি নাম, যা আজীবন তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে—”Medicare Fraud Convict”। -নজরুল ইসলাম মিন্টু, কানাডা থেকে প্রকাশিত দেশেবিদেশে টিভির নির্বাহী পরিচালক ও সাপ্তাহিক দেশেবিদেশের সম্পাদক

তথ্যসূত্র:
U.S. v. Sharmin Ahmed, Case No. 2:19-cr-20305 (Eastern District of Michigan)
HHS-OIG Home Health Fraud Report, 2022
Detroit Free Press Archive, October 2021
FBI Detroit Field Office, Medicare Fraud Releases (সংযুক্ত শারমিন আহমেদ-এর কল্পিত ছবি)