১১ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আর্ন্তজাতিক

যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্মাননা পেলেন ইলন মাস্কসহ ছয় উদ্ভাবক

যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্মাননা পেলেন ইলন মাস্কসহ ছয় উদ্ভাবক

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের “জাতীয় বিজ্ঞান পদক” গ্রহণ করেছেন চারজন, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে সম্মানিত আরও দুইজন; ছয় বিজয়ীর পাঁচজনই যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে জন্মগ্রহণকারী, বর্তমানে আমেরিকার নাগরিক ।

বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত বিশ্বের ছয়জন প্রভাবশালী প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবকদের মধ্যে রয়েছেন মহাকাশ প্রযুক্তির পথিকৃৎ ইলন মাস্ক, গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং এবং এএমডির প্রধান নির্বাহী লিসা সু।

গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত ‘Science: A New Golden Age’ শীর্ষক সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁদের হাতে সম্মাননা তুলে দেন। চারজনকে দেওয়া হয় ন্যাশনাল মেডেল অব সায়েন্স এবং অন্য দুজনকে ন্যাশনাল মেডেল অব টেকনোলজি অ্যান্ড ইনোভেশন।

হোয়াইট হাউসের আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই ছয় উদ্ভাবকের অবদানকে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতীয় বিজ্ঞান পদক পেলেন যাঁরা:

১. ইলন মাস্ক (Elon Musk) : মহাকাশ গবেষণা, প্রকৌশল, যোগাযোগব্যবস্থা এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে অবদানের জন্য ইলন মাস্ককে জাতীয় বিজ্ঞান পদকে ভূষিত করা হয়েছে। স্পেসএক্সের মাধ্যমে পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং মহাকাশযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রচেষ্টায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মাস্ককে আধুনিক যুগের টমাস এডিসনের সঙ্গে তুলনা করেন।

২. সের্গেই ব্রিন (Sergey Brin) : গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিনকে তথ্য অনুসন্ধান ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণের মৌলিক প্রযুক্তি উন্নয়নে অবদানের জন্য সম্মানিত করা হয়েছে। তাঁর গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ইন্টারনেটে তথ্য খোঁজার পদ্ধতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। আজ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ যে সহজে অনলাইনে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পান, তার পেছনে ব্রিনের প্রযুক্তিগত অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৩. জেনসেন হুয়াং (Jensen Huang) : এনভিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াংকে গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট বা জিপিইউ প্রযুক্তির উন্নয়নে অসামান্য অবদানের জন্য জাতীয় বিজ্ঞান পদক দেওয়া হয়েছে। একসময় মূলত কম্পিউটার গেমসের গ্রাফিকস তৈরিতে ব্যবহৃত জিপিইউ এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং অত্যন্ত জটিল হিসাব-নিকাশের অন্যতম প্রধান প্রযুক্তি।

এনভিডিয়ার উন্নত চিপ বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ৪. লিসা সু (Lisa Su) : এএমডির প্রধান নির্বাহী লিসা সু সেমিকন্ডাক্টর প্রকৌশল, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার এবং উন্নত প্রসেসর তৈরিতে অবদানের জন্য এই সম্মাননা পেয়েছেন।

বিশেষ করে তাঁর নেতৃত্বে উন্নত প্রসেসর ও চিপলেট প্রযুক্তির বিকাশ অত্যন্ত শক্তিশালী সুপারকম্পিউটার নির্মাণে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। বিশ্বের প্রথম এক্সাস্কেল সুপারকম্পিউটার তৈরিতে ব্যবহৃত প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গেও তাঁর অবদান যুক্ত রয়েছে।

প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে জাতীয় পদক পেলেন দুজন:

৫. মাইকেল ডেল (Michael Dell): ডেল টেকনোলজিসের প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল ডেলকে ব্যক্তিগত কম্পিউটার ও প্রাতিষ্ঠানিক কম্পিউটিং প্রযুক্তির প্রসার এবং বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি ব্যবসা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অবদানের জন্য সম্মানিত করা হয়েছে।

কম্পিউটারকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করে তোলা এবং আধুনিক প্রযুক্তি অবকাঠামো সম্প্রসারণে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে হোয়াইট হাউস।

৬. সত্য নাদেলা (Satya Nadella) : মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলাকে ক্লাউড কম্পিউটিং, বৃহৎ প্রযুক্তি অবকাঠামো এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য জাতীয় প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন পদকে ভূষিত করা হয়েছে।

তাঁর নেতৃত্বে মাইক্রোসফট ক্লাউড কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং অবকাঠামো নির্মাণে তাঁর অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

ছয় বিজয়ীর পাঁচজনই বিদেশে জন্মগ্রহণকারী

এবারের সম্মাননা অনুষ্ঠানের একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, ছয়জন বিজয়ীর মধ্যে পাঁচজনের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে। ইলন মাস্ক দক্ষিণ আফ্রিকায়, সের্গেই ব্রিন রাশিয়ায়, জেনসেন হুয়াং ও লিসা সু তাইওয়ানে এবং সত্য নাদেলা ভারতে জন্মগ্রহণ করেন। অন্যদিকে মাইকেল ডেলই একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার এই ঘটনা মার্কিন উদ্ভাবনী ব্যবস্থায় অভিবাসী মেধার অবদানকে নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত শিক্ষায় বিদেশে জন্মগ্রহণকারী গবেষক এবং উদ্যোক্তাদের অবদান যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

কী এই জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পদক?

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বিজ্ঞান পদক বা National Medal of Science দেশটির বিজ্ঞান ও প্রকৌশল ক্ষেত্রে অন্যতম সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। ১৯৬৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিজ্ঞান গবেষণায় অসামান্য অবদানের জন্য এই পদক প্রদান করে আসছেন।

অন্যদিকে ১৯৮৫ সালে প্রথম প্রদান করা হয় National Medal of Technology and Innovation। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই পদক দেওয়া হয়।

এই দুই সম্মাননার উদ্দেশ্য কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের স্বীকৃতি দেওয়া নয়; বরং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমে সমাজ ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা ব্যক্তিদের অবদানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত করা।

যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞান গবেষণায় ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ উদ্যোগ

সম্মাননা প্রদানের পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণায় ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ ও সহায়তার নতুন উদ্যোগ ঘোষণা করেছে। এই উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার, বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং দাতব্য সংস্থাগুলো অংশ নিচ্ছে।

ঘোষিত পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা সম্প্রসারণ, তরুণ বিজ্ঞানীদের সহায়তা, উন্নত কম্পিউটিং অবকাঠামো নির্মাণ এবং নতুন গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।

হোয়াইট হাউসের পৃথক তথ্যবিবরণী অনুযায়ী, বিজ্ঞান গবেষণায় উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় ২৪০ কোটি ডলারের প্রযুক্তিগত সহায়তা ও কম্পিউটিং সুবিধার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। তবে ঘোষিত অর্থের সবটাই সরাসরি সরকারি অনুদান নয়; এর মধ্যে বেসরকারি অংশীদারদের প্রতিশ্রুত সহায়তাও রয়েছে।

অভিবাসী মেধার স্বীকৃতির মধ্যেই অভিবাসননীতি নিয়ে বিতর্ক

এই সম্মাননা অনুষ্ঠানের দিনেই ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন ও বিদেশি কর্মী নিয়োগনীতি নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়। মাইক্রোসফটসহ কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কর্মসংস্থানভিত্তিক স্থায়ী অভিবাসন অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ সাময়িক স্থগিত করার ঘোষণা দেয় মার্কিন শ্রম বিভাগ।

একই দিনে মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলাকে জাতীয় প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন পদক প্রদান করা হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে বিদেশি মেধার গুরুত্ব এবং প্রশাসনের কঠোর অভিবাসননীতির মধ্যকার টানাপোড়েন নতুন করে আলোচনায় আসে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ

অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশ্বনেতৃত্ব ধরে রাখতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ গবেষণা, উন্নত কম্পিউটিং এবং নতুন প্রযুক্তির বিকাশকে তিনি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন।

হোয়াইট হাউসের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনীতি কার্যালয়ের পরিচালক মাইকেল ক্র্যাটসিওস বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতিতে ব্যক্তিগত সৃজনশীলতা, মেধা এবং উদ্ভাবনী নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, সম্মাননাপ্রাপ্ত ছয়জন উদ্ভাবক ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নতুন প্রজন্মের জন্য বার্তা

যুক্তরাষ্ট্রের এই রাষ্ট্রীয় সম্মাননা শুধু ছয়জন সফল প্রযুক্তি উদ্যোক্তার অর্জনের স্বীকৃতি নয়; এটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনার কথাও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশিসহ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অভিবাসী পরিবারের তরুণ প্রজন্মের জন্য ঘটনাটি তাৎপর্যপূর্ণ।

কারণ এবারের ছয় সম্মাননাপ্রাপ্ত ব্যক্তির পাঁচজনই যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে জন্মগ্রহণ করেছেন। তাঁদের সাফল্য দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক মেধা ও গবেষণার সুযোগ একত্র হলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে আসা এই উদ্ভাবকদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আবারও মনে করিয়ে দিল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় মেধা, গবেষণা এবং সৃজনশীলতার কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই। তথ্যসূত্র: হোয়াইট হাউস, ৮ অক্টোবর ২০২৬; রয়টার্স এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।