১২ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আর্ন্তজাতিক

‘আপনারা আরও হাততালি দিলে পুরস্কারটা ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি’: শান্তিতে নোবেল জয়ের পর ট্রাম্পকে খোঁচা পিল্লাইয়ের

‘আপনারা আরও হাততালি দিলে পুরস্কারটা ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি’: শান্তিতে নোবেল জয়ের পর ট্রাম্পকে খোঁচা পিল্লাইয়ের

আন্তর্জাতিক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকার আইনজীবী ও বিচারক ৮৫ বছর বয়সী নাভানেথেম নাভি পিল্লাই। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নরওয়ের রাজধানী অসলোর নোবেল ইনস্টিটিউট থেকে বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়।

নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ের খবর নিশ্চিত হওয়ার পর সাবেক জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে খোঁচা দিয়ে বলেন, উপস্থিত জনতা আরেকটু বেশি হাততালি দিলে এই পুরস্কারটি তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নেবেন। একই সঙ্গে জয়ের খবরটি তার কাছে এখনও পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।

পুরস্কার পাওয়ার বিষয়টি জানার পর উপস্থিত শুভানুধ্যায়ীদের সামনে অনানুষ্ঠানিক এক প্রতিক্রিয়ায় পিল্লাই জানান, নিজের কাজের ডেস্ক থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার পর ক্রিস্টফ নামের এক ব্যক্তি তাকে নোবেল জয়ের খবরটি জানান।

সংবাদটি শুনে নিজের প্রথম অনুভূতির কথা জানিয়ে সাবেক এই বিচারক ও আইনজীবী বলেন, ‘এটি নিশ্চয়ই কোনো কৌতুক। আপনাদের এই করতালি আমার কাছে অনেক বড় বিষয়। তবে একজন আইনজীবী ও বিচারক হিসেবে বিষয়টি আমি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করে দেখতে চাই!’

উপস্থিত জনতার উচ্ছ্বাসের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে খোঁচা দিয়ে তিনি রসিকতা করে আরও বলেন, ‘আপনারা যদি আরেকটু বেশি হাততালি দেন, তবে আমি পুরস্কারটা ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি।’ গত বছর হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন, বিশ্বের এই অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারটি তার প্রাপ্য।

এবছরও পুরস্কার জেতার দাবি করতে ভুলেননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি ২০২৬ সালের পুরস্কারের জন্য যাকে মনোনীত করেছে সে বিষয়ে গত বুধবার (৭ অক্টোবর) তিনি বলেছেন, ‘নোবেল শান্তি পুরস্কার তারই পাওয়া উচিত।’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘তাদের সিদ্ধান্ত কী হতে যাচ্ছে তা আমি জানি না। আমার মতো মানুষদের হয়তো পুরস্কার না দেওয়ার জন্য তাদের একটা সুনাম (বা অপনাম) আছে।’

ওইদিন ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প আরও বলেন, ‘এখন তো সেটারই সময় হয়েছে। তবে গতবার যিনি এটি পেয়েছিলেন তার কাছ থেকে পরোক্ষভাবে এই সম্মান গ্রহণ করতে পেরে আমি অত্যন্ত গর্বিত বোধ করেছিলাম, কারণ তিনি বলেছিলেন, ইতিহাসের আর কেউ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চেয়ে এটি পাওয়ার জন্য বেশি যোগ্য নয়।’

ভেনেজুয়েলায় তার প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পাওয়ার অংশ হিসেবে দেশটির বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো গত জানুয়ারিতে ট্রাম্পকে তার ২০২৫ সালের প্রাপ্ত নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদকটি উপহার দেন। গত বছরের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আটটি সংঘাতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে যুক্ত করার পর ট্রাম্প বলেন, ‘এই পুরস্কারটি তারই পাওয়া উচিত।’

সাবেক বিচারকের শান্তিতে নোবেল জেতার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আইসিসির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) একজন সাবেক বিচারক শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হেগভিত্তিক এই আদালতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) একজন সাবেক বিচারক শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হেগভিত্তিক এই আদালতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ঘোষিত এ পদক্ষেপে ইউরোপীয় মিত্রদের সাথে ওয়াশিংটনের বড় ধরনের কূটনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়ে আইসিসির ডেপুটি প্রসিকিউটর নাজাত শামীম খান বলেছেন, ‘এসব নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারিক কার্যক্রম থামাতে পারবে না।’

যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচারে আন্তর্জাতিক আদালতের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই বৈরি মনোভাব দেখিয়ে আসছে। এর আগে আদালতটির প্রসিকিউটর ও বিচারকদের ওপর ব্যক্তিপর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও শুক্রবারের এই পদক্ষেপ বহুদূর গড়িয়েছে। এর ফলে আদালতটিকে সেবাদানকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানিও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কখনই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে আমেরিকানদের বিচার করার সুযোগ দেবেন না।’

তিনি আরও বলেন, ‘সেই কারণেই আজ যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। আমরা এই বেপরোয়া আদালতের সাথে সমস্ত আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন নিষিদ্ধ করব, যাতে তাদের সম্পদ বিচ্ছিন্ন করে কার্যকরভাবে বিচারিক কার্যক্রম অচল করে দেওয়া যায়।’

যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞার কড়া সমালোচনা করে আইসিসির ডেপুটি প্রসিকিউটর খান রয়টার্সকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক বিচারব্যবস্থা এবং একটি স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠানের কাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যেই এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের চলমান সমস্ত পরিস্থিতি, তদন্ত এবং বিচারিক কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে যাবে।’

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ একাধিক ইসরায়েলি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং আফগানিস্তানে আমেরিকার সেনাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে অতীতে তদন্ত শুরু করায় আইসিসির ওপর চরম ক্ষুব্ধ হয় ওয়াশিংটন। তবে আফগানিস্তানসংক্রান্ত সেই তদন্তের অগ্রাধিকার ইতোমধ্যে কমিয়েছে আইসিসি।

বর্তমানে বিশ্বের ১২৫টি দেশ আইসিসির সদস্য, যার মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সব দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক ছাড়া ন্যাটো জোটের সব সদস্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র দেশগুলো অতীতে আন্তর্জাতিক আদালতটির প্রতি প্রকাশ্যে জোরালো সমর্থন জানিয়েছে। উল্লেখ্য, ন্যাটো ও ইইউ সদস্য দেশ নেদারল্যান্ডসে আইসিসির সদর দপ্তর অবস্থিত।

শুক্রবার (০৯ অক্টোবর) নোবেল শান্তিতে ভূষিত হওয়া দক্ষিণ আফ্রিকান আইনবিদ নাভি পিল্লাই ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আইসিসির আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নোবেল কমিটি তাদের বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট জানিয়েছে, এমন এক সময়ে বিচারক ও আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে পড়েছে, যখন নাভি পিল্লাইকে সম্মানিত করে নোবেল কমিটি ‘একটি জরুরি স্মারক বার্তা’ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

নোবেল কমিটি উল্লেখ করে, ‘একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্বের পূর্বশর্ত হলো এমন একটি আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে যুদ্ধাপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা ন্যায়বিচার পাবেন।’

তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছেন, আদালত এবং এর সদস্য দেশগুলোকে ওয়াশিংটনের উদ্বেগগুলো নিরসনের সুযোগ দিতেই নিষেধাজ্ঞার কাঠামোটি বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে।

মিত্রদের লাগাম টানার তাগিদ যুক্তরাষ্ট্রের

সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা এলে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে একাউন্টগুলো বন্ধ করতে হয়, বীমা কোম্পানিগুলো কাভারেজ বাতিল করে এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সফটওয়্যার সহযোগিতা স্থগিত করতে হয়।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও আইসিসির কর্মকর্তাদের ওপর নির্দিষ্ট কিছু নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল, যা পরে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে তুলে নেওয়া হয়। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় আবারও নতুন করে আইসিসির ওপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার ছায়া নেমে আসে।

আন্তর্জাতিক আদালত হিসেবে আইসিসিও বিগত কয়েক মাস ধরে তাদের ওপর সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আসার আশঙ্কায় পূর্বপ্রস্তুতি নিচ্ছিল। আদালতের কম্পিউটার থেকে মাইক্রোসফটের সফটওয়্যার সরিয়ে ওপেন সোর্স সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে এবং ব্যাংকিং ও স্বাস্থ্যবীমার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি রাখা হয়েছে।

চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে আইসিসির রেজিস্টার অসভালদো জাভালা গিলার ইউরোপীয় ইউনিয়নকে একটি বিশেষ ‘ব্লকিং মেকানিজম’ ব্যবহারের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকা অঞ্চলগুলোর প্রভাব থেকে ইউরোপীয় দেশগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, আইসিসি এবং রোম সনদে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ মেটাতে ব্যর্থ হওয়াতেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

রুবিও বলেন, ‘হয় আইসিসি তাদের হুমকি বন্ধ করবে, না হয় আমরা আইসিসির ইতি টানব। আমরা আশা করি আমাদের মিত্ররা—যাদের অনেকেই আইসিসির অংশ এবং সুরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভর করে—তারা এই আদালতের ওপর লাগাম টানবে।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘সদস্য দেশগুলো যেন আলোচনা করে আমাদের উদ্বেগ নিরসনে কোনো সমাধান উপস্থাপন করতে পারে, সেজন্যই আমরা এই পদক্ষেপের পথ খোলা রেখেছি। তবে এসব প্রচেষ্টা যদি ফলপ্রসূ না হয়, তবে আমরা পরিস্থিতি অনুযায়ী আরও ব্যবস্থা নেব।’ – রয়টার্স