সৈয়দ কামরুল : বিমূর্তবাদী চিত্রকর খুরশিদ সেলিমের একক চিত্র প্রদর্শনী দেখতে গিয়েছিলাম নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ডে। ভেুন্যু ছিল বেয়ার্ড কাটিং আর্বারিটাম এর ম্যানর হাউজ অ্যানেক্স গ্যালারি। জায়গাটাকে বলা হয়, ‘ওয়েসিস অব বিউটি’। টিউডর স্থাপত্যের নান্দনিক ও দৃশ্যকাব্যিক ল্যান্ডস্কেপে ছবি প্রদর্শনীর ভেন্যু নির্বাচন করাটা খুরশিদ সেলিমের শিল্পমনস্কতার প্রকাশ। এই শৈল্পিক ল্যান্ডস্কেপে চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে শিল্পী তার সলো এক্সিবিউশনকে ভিন্নতর শিল্পমাত্রা জুড়ে দিয়েছিলেন।
পুরো দোতলা জুড়ে ছিল তার ছবির প্রদর্শনী। দর্শকদের প্রায় সবাই ছিল সফেদ আমেরিকান। তাদের মধ্যে শালপ্রাংশু দাড়িয়ে ছিল ‘মাহে-মনি আর্টস অ্যান্ড স্পোর্টস মিউজিয়াম’ এর প্রতিষ্ঠাতা সাঈদ উর রব। অবাক হই, সেখানে কোনো কবি ও লেখকদের দেখিনি। বিষয়টা আমাকে থমকে দেয়। প্রদর্শনীতে বাঙালি কবি-লেখকদের অনুপস্থিতি দেখে চিত্রকলার প্রতি তাঁদের যে উদাসীনতা সেটা আমার মনে হতাশা জাগায়। কবি, লেখক ও চিত্রশিল্পীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এক সৃজনশীল বন্ধন রয়েছে। ফরাসি কবি ও ঔপন্যাসিকদের অনেকেই আর্ট-ক্রিটিক ও চিত্রকর ছিলেন। তারা চিত্রকর এবং চিত্রকলার প্রতি প্রবল আচ্ছন্ন থাকতেন। ফরাসি কবিদের মতো মার্কিন ও ল্যাটিন কবিতার দুই দিকপাল ডব্লিউ. এস. মারউইন এবং পাবলো নেরুদা কবিতাকে চিত্রকলার সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত একটি দৃশ্যকলা হিসেবে গণ্য করতেন।

চিত্রকলা সম্পর্কে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির একটা ক্লাসিক কথা আছে , “Painting is silent poetry, and poetry is painting that speaks”— অর্থাৎ পেইন্টিংস নীরব কবিতা এবং কবিতা হচ্ছে সেই পেইন্টিংস যা রংয়ে রংয়ে কবিতার বাঙময়তা ছড়িয়ে দেয়। পেইন্টিংস প্রায়শই কবিতাকে অনুপ্রাণিত করে। ছবির visual metaphor এবং সাহিত্যের literal picture -মূলতঃ সমার্থক। আধুনিক কবিতার অন্যতম পথিকৃৎ এবং সাহিত্যিক আভাঁ-গার্দ আন্দোলনের অগ্রদূত শার্ল বোদলেয়ার ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর একজন পাইওনিয়ার আর্ট ক্রিটিক, যাকে ‘critique d’art’ বলা হয়। চিত্রকর্মের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে তিনি চিরতরে বদলে দিয়েছিলেন।
হেমিংওয়ে কোনো লেখকের অনুকরণে কলম ধরেননি; বরং তিনি লিখতে চেয়েছিলেন ঠিক যেভাবে পল সেজান তাঁর ছবি আঁকতেন। সেজান খুব অল্প কয়েকটি তুলির আঁচড়ে এবং গাঢ়, দৃঢ় রঙে মানুষ ও প্রাকৃতিক দৃশ্য এঁকেছেন। তবু তাঁর চিত্রকর্মে এমন এক অনুভূতি, এমন এক কাহিনি, এমন এক প্রাণময়তা ফুটে ওঠে, যা মোটেই সরল নয়। এই বিষয়টিই হেমিংওয়েকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। প্যারিসে লস্ট জেনারেশনের ভ্যাগাবন্ড দিনে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে নিয়মিত প্যারিসের ম্যুজে দ্যু লুক্সেমবুর্গ-এ যেতেন, কারণ তিনি পল সেজানের চিত্রকর্মের এক গভীর অনুরাগী ছিলেন। হেমিংওয়ের বিশ্বাস ছিল, সেজান যে আঙ্গিকে একটি ভূদৃশ্য আঁকেন, তেমনিভাবে তিনি তার গদ্যকাঠামোর নির্মিতি শিখতে পারবেন।
সেজানের চিত্রকর্মের visual innovations হেমিংওয়েকে প্রভাবিত করেছিল। ব্যাকগ্রাউন্ডে কম ফোকাস বা মিনুসিয়া (minutiae) উপস্থাপন করার সেজানের ধারণাকে হেমিংওয়ে তাঁর গল্পে অভিযোজিত (adapt) করেছিলেন। সেখান থেকেই হেমিংওয়ের থিওরি অব আইসবার্গ গল্পরীতির উদ্ভব। একবার তিনি লিখেছিলেন, সেজানের ছবিগুলো তাঁকে শিখিয়েছে— “কীভাবে ভূদৃশ্য নির্মাণ করতে হয়।” কিন্তু তিনি শুধু প্রকৃতির বর্ণনার কথা বলেননি। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন—রচনার কাঠামো, গভীরতা, ভারসাম্য এবং আবেগের জ্যামিতি।
রিলকে সেজানের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছিলেন—ঠিক যেমনটি শিখেছিলেন হেমিংওয়ে। সেজান কিছুতেই বালজাককে প্রভাবিত করেনি যেমনটা রিলকে এবং হেমিংওয়েকে করেছিল। চিত্রশিল্পীদের সাথে জোলার যোগাযোগ তার লেখালেখিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। জোলার সেই বহুশ্রুত কথা, “আমি কেবল ইমপ্রেশনিস্টদের পক্ষেই দাঁড়াইনি; তাদের চিত্রকলার নন্দনতত্ত্বকে সাহিত্যের ভাষায় রূপান্তর করেছি।” উদাহরণস্বরূপ, তার উপন্যাস “দ্য বেলি অফ প্যারিস” এ বাজারের যে বর্ণনা রয়েছে সেটা তার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করে।

প্যারিসের কেন্দ্রীয় বাজার ‘লে হাল’ (Les Halles)-কে কেন্দ্র করে লেখা ওই উপন্যাসে পাঠককে মূলতঃ রোদ ওঠার পথ ধরেই ভোরের সূচনায় এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। উপন্যাসের শুরুটা হয় ঘোর অন্ধকারে, যখন গভীর রাতে শাকসবজি চাষিরা তাদের পণ্যবোঝাই গাড়ি নিয়ে প্যারিসের দিকে রওনা হয়। যাত্রাপথে মাদাম ফ্রঁসোয়া নামের এক নারী ব্যবসায়ীর ঘোড়াটি হঠাৎ একটি অস্পষ্ট কালো জিনিসের ওপর হোঁচট খেতে খেতে বেঁচে যায়। গাড়িতে ঝোলানো ছোট লণ্ঠনের আলোয় কিছুই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল না বলে মাদাম ফ্রঁসোয়া নিচে নেমে আসেন; তিনি অস্পষ্টভাবে সেখানে একটা লোককে পড়ে থাকতে দেখেন এবং তাকে নিজের গাড়িতে তুলে নেন।
ফ্লোরঁ নামের এই ব্যক্তিটি আসলে কায়েনের দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদিদের উপনিবেশ থেকে পালিয়ে আসা এক পলাতক আসামি, যে প্যারিসের বিশাল জনসমুদ্রের আড়ালে আত্মগোপন করার আশা করছিল। অন্ধকার চিরে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে ওঠা সেই মহানগরের দিকে তারা ধীরগতিতে এগিয়ে চলে। এই দৃশ্যপট ও তার প্রভাব ফুটিয়ে তুলতে জোলা ব্যবহার করেছিলেন চলচ্চিত্রের ‘ট্র্যাকিং শট’-এর মতো সাহিত্যিক টেকনিক। মানে (Manet) চিত্রকর্ম সম্পর্কে বলেছিলেন: শুরুতে চোখ কেবল রঙের বড় বড় প্রলেপ বা ছোপ দেখতে পায়; এরপরই বিভিন্ন বস্তু বা অবয়ব ফুটে ওঠে ও নিজ নিজ স্থান গ্রহণ করে; আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো ছবিটি হয়ে ওঠে বলিষ্ঠ ও সুষ্পষ্ট।
উপন্যাসে ফ্লোরঁ যখন ভোরের আলোয় সেখানে পৌঁছায়—জ্বরে আক্রান্ত, ক্ষুধার্ত ও টলোমলো পায়ে—এবং শহরটিকে চিনে উঠতে পারে না, তখন জোলা ঠিক এই পদ্ধতিটিই ব্যবহার করেছেন। খুরশিদ আলম সেলিম একজন বিমূর্তবাদী চিত্রকর। বলা যেতে পারে, একজন Abstract Expressionist artist বা বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদী চিত্রকর। আন্তর্জাতিক বলয়ে তার পরিচিতি রয়েছে। ইউরোপ ও এসিয়ার অনেক দেশের আর্ট গ্যালারি ও নিউ ইয়র্কের SoHo তে তার বেশ কিছু প্রদর্শনী প্রশংসিত হয়েছে। এই প্রদর্শনীতে ছবিপ্রেমী দর্শকদের প্রায় সবাই ছিল আমেরিকান। তারা ছবিগুলো দেখছিলো মগ্নচোখে। কেউ কাছ থেকে, কেউ ডিসট্যান্স থেকে, কেউ বা কোনাকুনি জায়গা থেকে ঘুরেফিরে দেখছিল ছবিগুলো। তাদের দৃক তর্জমা করছিল চোখজুড়ানো ছবিগুলোর রঙ, আকৃতি, রেখা, বুনন বিন্যাসের রংভাষা।
সেলিমের চিত্রকর্মে বস্তুকে খণ্ড খণ্ড করে দেখানো হয়েছে, যা একাধিক দৃষ্টিকোণ তুলে ধরে। বিমূর্তবাদ ও পরাবাস্তব চিত্রধারার মিল ও নৈকট্য দেখি তাঁর ছবিতে। উপরিভাগের আক্ষরিক চিত্রের ভিতরে ও স্তরে কল্পনা, আবেগ এবং অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাকে বেশি দেখি। পরাবাস্তববাদী চিত্র যখন বাস্তব অবয়ব ছাপিয়ে বিমূর্ত রূপ নেয় তখন পরাবাস্তববাদী ছবিকে বিমূর্তবাদী মনে হয়। খুরশিদ সেলিমের কোনো কোনো ছবিকে পরাবাস্তববাদী ছবি মনে হতে পারে। তবে অবচেতন মন, স্বপ্ন, কল্পনা ও প্রতীককে কেন্দ্র করে সুররিয়ালিজম কখনো বিমূর্ততার আশ্রয় নেয়; কিন্তু বিমূর্তবাদ নিজে সুররিয়ালিজমকে ধারণ করে না।

খুরশিদ সেলিমের ছবি শিল্পপিয়াসী মনকে মগ্ন করে, শিল্পদৃক চোখের দিদৃক্ষা টানে। আমি আর্ট ক্রিটিক নই; তবে, পেইন্টিংস সম্পর্কে আমি philistine বা শিল্পবোধহীন নই। ছবি আমাকে টানে। খুরশিদ সেলিমের ছবি আমাকে টানে। খুরশিদ সেলিমের চিত্রকর্ম শিল্পবোধ ও নান্দনিক রুচিসম্পন্ন দর্শকের কাছে বিশেষ আবেদন সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষত, চিত্রকলায় পরাবাস্তব ও অভিব্যক্তিবাদের প্রতি যাঁদের অনুরাগ রয়েছে, তাঁর কাজ তাঁদের মনে গভীরতর অনুরণন তুলবে।
চারুকলার শিক্ষকদের কেউ কেউ সেলিমের আর্ট ফর্মস ও কন্টেন্টস সম্পর্কে বলতেন, খুরশিদ সেলিমকে মার্ক রথকো প্রভাবিত করেছে বিপুল। আমি দুজনের ছবি মনোযোগ দিয়ে দেখেছি। বিস্তৃত রঙের ক্ষেত্র ব্যবহারে সাদৃশ্য দেখি। রথকোর ছবিতে সাধারণত নরম, ঝাপসা বা ধীরে মিশে যাওয়া দেখি কিন্তু সেলিমের ছবিতে দেখি তীক্ষ্ণ, কৌণিক ও স্পষ্ট প্রান্ত। কোথাও কোথাও অভিব্যক্তিময় জৈব আকৃতির সঙ্গে জ্যামিতিক বিমূর্ততার সংমিশ্রণ, রথকোর কালার-ফিল্ড চিত্রকলার কথা মনে করিয়ে দিতে পারে। কিন্তু পন্ডিতদের অভিমত হলো, সেলিমের চিত্রকলায় রথকোর প্রভাব থাকলেও সেলিম নিজস্ব রীতি নির্মাণে সতন্ত্র হয়ে নিজস্ব শৈলী নির্মাণ করেছেন।
আন্তর্জাতিক বলয়ে পরিচিত খুরশিদ সেলিম স্থায়ী হয়েছেন মার্কিন মুলুকে। তাঁর জীবনসঙ্গী শামিমা বেগম একজন ইম্প্রেশনিস্ট চিত্রকর। দীর্ঘ তিনযুগেরও বেশি সময় ধরে এই শিল্পীদম্পতি নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ডে বসবাস করছেন। সেখানে রয়েছে ওদের নিভৃত স্টুডিও — রং তুলির নিঝুম-সরব আর্কেডিয়া।



















