“ঘুমানোর সময় কোথায়?”—ব্যস্ত মানুষদের মুখে কথাটি প্রায়ই শোনা যায়। কেউ রাত জেগে কাজ করেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটান, কেউ আবার চার-পাঁচ ঘণ্টা ঘুমিয়েও গর্ব করে বলেন, “আমার এতেই চলে।”
কিন্তু শরীরের হিসাব একটু ভিন্ন। প্রতিদিন প্রয়োজনের তুলনায় কম ঘুম হলে সেই ঘাটতি ধীরে ধীরে জমতে থাকে। এটিকেই সহজভাবে ‘ঘুমের ঋণ’ বলা যায়। ব্যাংকের ঋণের মতো এটি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এর সুদ দিতে হয় মনোযোগ, স্মৃতি, মেজাজ, বিপাক, হৃদ্স্বাস্থ্য এবং কখনো দুর্ঘটনার ঝুঁকির মাধ্যমে। ঘুম অলসতার লক্ষণ নয়। খাওয়া, পানি পান ও শ্বাস নেওয়ার মতোই এটি শরীরের মৌলিক প্রয়োজন।
কত ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন?
সব মানুষের ঘুমের প্রয়োজন এক নয়। বয়স, শারীরিক অবস্থা ও জীবনযাত্রার কারণে কিছু পার্থক্য হতে পারে। তবে সাধারণভাবে ১৮–৬০ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুম দরকার। ৬১–৬৪ বছর বয়সীদের সাধারণত ৭–৯ ঘণ্টা এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের ৭–৮ ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেওয়া হয়।
সাফল্যের জন্য কখনো কখনো রাত জাগতে হতে পারে, কিন্তু রাত জাগাকেই জীবনযাত্রায় পরিণত করা সাফল্যের কৌশল নয়। ঘুম থেকে সময় কেটে আমরা হয়তো কাজের জন্য কয়েক ঘণ্টা ধার নিই; পরে শরীর সেই ঋণ আদায় করে ক্লান্তি, ভুল সিদ্ধান্ত, অসুস্থতা কিংবা দুর্ঘটনার ঝুঁকির মাধ্যমে। ভালো ঘুম বিলাসিতা নয়, দুর্বলতাও নয়। এটি সুস্থ মস্তিষ্ক, নিরাপদ কর্মজীবন এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের ভিত্তি। দিনের পরিকল্পনা তাই সকালে নয়—আগের রাতের যথেষ্ট ঘুম থেকেই শুরু হওয়া উচিত।
কিশোর-কিশোরীদের প্রয়োজন আরও বেশি—সাধারণত ৮–১০ ঘণ্টা। অথচ পড়াশোনা, কোচিং, পরীক্ষা, মোবাইল ফোন এবং রাত জাগার কারণে তাদের অনেকেই নিয়মিত প্রয়োজনের তুলনায় কম ঘুমায়। শুধু সময়ই যথেষ্ট নয়; ঘুমের মানও গুরুত্বপূর্ণ। বিছানায় আট ঘণ্টা থাকলেও যদি বারবার ঘুম ভেঙে যায়, শ্বাস আটকে আসে বা সকালে উঠে সতেজ না লাগে, তবে সেটিকে ভালো ঘুম বলা যায় না।
কম ঘুমে শরীরে কী ঘটে?
এক রাত কম ঘুমালে পরদিন ক্লান্তি, বিরক্তি বা মনোযোগের ঘাটতি হতে পারে। কিন্তু নিয়মিত কম ঘুমালে প্রভাব আরও গভীর হয়।
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শেখা, স্মৃতি, মনোযোগ, বিচারবোধ ও প্রতিক্রিয়ার গতি দুর্বল হতে পারে। মানুষ নিজের সক্ষমতা অতিমূল্যায়নও করতে পারে—অর্থাৎ তিনি বুঝতেই পারেন না যে তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে গেছে।
দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত বা নিম্নমানের ঘুমের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, স্থূলতা, কিডনি রোগ ও বিষণ্নতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কম ঘুম ক্ষুধা ও বিপাক নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে মানুষ বেশি খেতে পারেন, বিশেষ করে উচ্চ ক্যালরির খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে পারে।
ঘুমের ঘাটতি রোগপ্রতিরোধব্যবস্থাকেও দুর্বল করতে পারে। তাই পর্যাপ্ত ঘুম শুধু পরদিন সতেজ থাকার বিষয় নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবারও অংশ।
গাড়ি চালানো ও কর্মক্ষেত্রে লুকানো বিপদ
তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় গাড়ি চালানো অত্যন্ত বিপজ্জনক। ঘুম ঘুম চোখে মানুষ দূরত্ব, গতি ও ঝুঁকি ঠিকভাবে বুঝতে পারেন না। কয়েক সেকেন্ডের জন্য ‘মাইক্রোস্লিপ’ হতে পারে—চোখ খোলা থাকলেও মস্তিষ্ক সাময়িকভাবে সাড়া দেওয়া বন্ধ করে দেয়। মহাসড়কে কয়েক সেকেন্ডই বড় দুর্ঘটনার জন্য যথেষ্ট।
রাতের শিফট শেষে যাঁরা গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফেরেন, তাঁদের বিশেষ সতর্ক হওয়া দরকার। জানালা খোলা, জোরে গান শোনা বা মুখে পানি দেওয়া ঘুমের বিকল্প নয়। গাড়ি চালানোর সময় চোখ বুজে আসা, বারবার হাই ওঠা, লেন ধরে রাখতে কষ্ট হওয়া বা শেষ কয়েক মাইলের কথা মনে না থাকা—এসব বিপদের সংকেত। নিরাপদ স্থানে গাড়ি থামিয়ে বিশ্রাম নেওয়াই সঠিক সিদ্ধান্ত।
চিকিৎসকদের জন্য ঘুম কেন রোগী-নিরাপত্তার বিষয়
চিকিৎসা পেশায় দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, রাতের দায়িত্ব, অন-কল সেবা এবং মানসিক চাপ পরিচিত বাস্তবতা। কিন্তু ক্লান্তিকে পেশাগত দক্ষতার প্রমাণ ভাবা বিপজ্জনক। ঘুমের অভাবে চিকিৎসকের মনোযোগ, স্বল্পমেয়াদি স্মৃতি, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ, দলগত যোগাযোগ ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চিকিৎসাব্যবস্থায় ক্লান্তিকে একটি সুপ্ত নিরাপত্তা-ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ এটি ভুলের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।
সমাধানটি শুধু ব্যক্তিগতভাবে “আরও শক্ত হওয়া” নয়। হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানকে যুক্তিসংগত শিফট, পর্যাপ্ত বিরতি, বিশ্রামের সুযোগ, নিরাপদ যাতায়াত এবং ক্লান্তি শনাক্ত করার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। সহকর্মী অত্যন্ত ক্লান্ত থাকলে তাঁকে সাহায্য করাও রোগী-নিরাপত্তার অংশ।
ভালো ঘুমের জন্য সাতটি বাস্তব পদক্ষেপ
একই সময় ঘুমানো ও ওঠার চেষ্টা করুন। ছুটির দিনেও সময়ের পার্থক্য খুব বেশি না রাখলে শরীরের জৈবঘড়ি নিয়মিত থাকে। ঘুমের আগে আলো ও পর্দা কমান। শোয়ার অন্তত ৩০ মিনিট আগে মোবাইল, ট্যাবলেট ও কম্পিউটার বন্ধ বা দূরে রাখুন। বিছানায় শুয়ে সংবাদ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখা ঘুমকে পিছিয়ে দেয়। বিকেলের পর ক্যাফেইন কমান। কফি, চা, এনার্জি ড্রিংক এবং কিছু কোমল পানীয়তে ক্যাফেইন থাকে। এর প্রভাব কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে।
রাতে ভারী খাবার ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন। অ্যালকোহলে দ্রুত ঘুম এলেও রাতের দ্বিতীয় ভাগে ঘুম ভেঙে যেতে পারে এবং ঘুমের মান খারাপ হতে পারে। শোবার ঘর শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখুন। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি গরম ঘরও ঘুম ব্যাহত করতে পারে। দিনে নিয়মিত শরীরচর্চা করুন। হাঁটা বা ব্যায়াম ঘুমের মান উন্নত করতে পারে। তবে ঘুমানোর একেবারে আগে তীব্র ব্যায়াম কারও কারও ঘুমে বাধা দেয়। ঘুমকে সময়সূচির অংশ করুন। কাজ, মিটিং বা ব্যায়ামের মতো ঘুমের সময়ও ক্যালেন্ডারে গুরুত্ব দিয়ে রাখুন। “সব কাজ শেষ হলে ঘুমাব”—এই পরিকল্পনায় কাজ সাধারণত শেষ হয় না, শুধু ঘুম কমে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন?
নিয়ম মেনেও যদি তিন মাস বা তার বেশি সময় ঘুমাতে সমস্যা হয়, দিনের বেলায় অতিরিক্ত তন্দ্রা থাকে, কাজে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয় বা ঘুমের জন্য নিয়মিত ওষুধের প্রয়োজন পড়ে, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া, হাঁসফাঁস করে ওঠা, সকালে মাথাব্যথা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া বা যথেষ্ট সময় ঘুমিয়েও সারাদিন ক্লান্ত থাকা অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ হতে পারে। স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদ্রোগ থাকলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
শেষ কথা
সাফল্যের জন্য কখনো কখনো রাত জাগতে হতে পারে, কিন্তু রাত জাগাকেই জীবনযাত্রায় পরিণত করা সাফল্যের কৌশল নয়। ঘুম থেকে সময় কেটে আমরা হয়তো কাজের জন্য কয়েক ঘণ্টা ধার নিই; পরে শরীর সেই ঋণ আদায় করে ক্লান্তি, ভুল সিদ্ধান্ত, অসুস্থতা কিংবা দুর্ঘটনার ঝুঁকির মাধ্যমে।
ভালো ঘুম বিলাসিতা নয়, দুর্বলতাও নয়। এটি সুস্থ মস্তিষ্ক, নিরাপদ কর্মজীবন এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের ভিত্তি। দিনের পরিকল্পনা তাই সকালে নয়—আগের রাতের যথেষ্ট ঘুম থেকেই শুরু হওয়া উচিত।
লেখক: কনসালট্যান্ট গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট, অরল্যান্ডো হেলথ, ফ্লোরিডা শিক্ষক, গবেষক, লেখক ও স্বাস্থ্যসেবা প্রশাসক।













