নিউইয়র্ক সিটি মেয়র জোহরান মামদানিকে ঘিরে ইসরায়েল, ইহুদি নিরাপত্তা এবং ইহুদিবিদ্বেষ নিয়ে নতুন করে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সম্পর্কে মামদানির কঠোর বক্তব্য, গাজা যুদ্ধ নিয়ে তার অবস্থান এবং নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নিয়ে নিউইয়র্কের ইহুদি সম্প্রদায়ের একটি অংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে এসব বক্তব্য সরাসরি ইহুদিবিদ্বেষমূলক অপরাধ বাড়িয়েছে—এমন প্রত্যক্ষ কারণ-ফল সম্পর্ক এখন পর্যন্ত সরকারি পরিসংখ্যানে প্রমাণিত হয়নি।
সাম্প্রতিক বিতর্কের সূত্রপাত মূলত মামদানির ইসরায়েলবিষয়ক অবস্থান নিয়ে। তিনি নেতানিয়াহুকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি নির্বাচনী প্রচারের সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের পরোয়ানার ভিত্তিতে নেতানিয়াহুকে নিউইয়র্কে এলে গ্রেপ্তারের কথা বলেছিলেন। পরে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর সিটির আইনগত পর্যালোচনায় স্পষ্ট হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওই পরোয়ানা বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা নিউইয়র্ক সিটি প্রশাসনের নেই। গত জুলাইয়ে মামদানি বিষয়টি স্বীকার করেন এবং বলেন, সিটির স্থানীয় আইন মেনেই তার প্রশাসন কাজ করবে।
এখানেই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। মেয়র মামদানির বক্তব্যকে তার সমালোচকেরা ইসরায়েলবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখছেন এবং তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, এ ধরনের কঠোর ভাষা নিউইয়র্কের ইহুদি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক পরিবেশ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে মামদানি নিজে ইহুদি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বলেছেন, ইহুদি নিউইয়র্কবাসীর নিরাপত্তা তার প্রশাসনের অন্যতম দায়িত্ব।
গত আগস্টে সিটি হলে একদল ইহুদি ধর্মীয় নেতা মেয়র মামদানির সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে ইসরায়েল নিয়ে তার বক্তব্যের সামাজিক প্রভাব এবং নিউইয়র্কের ইহুদি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়। বৈঠকে অংশ নেওয়া কয়েকজন ধর্মীয় নেতা মনে করেন, ইসরায়েল সরকারের নীতির সমালোচনা এবং ইহুদিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষের মধ্যে পরিষ্কার পার্থক্য তুলে ধরা জরুরি। তাদের বক্তব্য ছিল, ইসরায়েলের নীতির বিরোধিতা করা যেতে পারে, কিন্তু এমন ভাষা ব্যবহার করা উচিত নয় যা নিউইয়র্কের সাধারণ ইহুদি জনগোষ্ঠীকে কোনো বিদেশি সরকারের কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী করে তুলতে পারে।
তবে তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের অপরাধের পরিসংখ্যান। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত পাওয়া সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ইহুদিদের লক্ষ্য করে নিশ্চিত ইহুদিবিদ্বেষী অপরাধের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২৯টি। একই সময়ে আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ২১২টি। অর্থাৎ এক বছরে বৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৮ শতাংশ। একই সময়ে সব ধরনের নিশ্চিত বিদ্বেষমূলক অপরাধের সংখ্যা ২০২৫ সালের ৩৬৭টি থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ৪২৫টিতে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি।
এই পরিসংখ্যান আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। চলতি বছরে নিশ্চিত হওয়া মোট ৪২৫টি বিদ্বেষমূলক অপরাধের মধ্যে ২২৯টি ইহুদিদের লক্ষ্য করে সংঘটিত হয়েছে। অর্থাৎ মোট ঘটনার প্রায় ৫৪ শতাংশ। নিউ ইয়র্ক সিটির মোট জনসংখ্যার তুলনায় ইহুদি জনগোষ্ঠীর অংশ আনুমানিক ১০ শতাংশ হওয়ায় সংখ্যাটি উল্লেখযোগ্য। সেপ্টেম্বরে মেয়রের কার্যালয়ের এক নিরাপত্তা আলোচনাতেও বলা হয়, বছরের প্রথম আট মাসে সিটির নিশ্চিত বিদ্বেষমূলক অপরাধ ১৬ শতাংশ এবং ইহুদিবিদ্বেষী অপরাধ ৯ শতাংশ বেড়েছে।













