২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

খেলা

‘পদত্যাগ করো, নইলে অনাস্থা ভোটে গদিচ্যুত করা হবে’—ফিফা-প্রধান ইনফান্তিনোকে উয়েফার আলটিমেটাম

‘পদত্যাগ করো, নইলে অনাস্থা ভোটে গদিচ্যুত করা হবে’—ফিফা-প্রধান ইনফান্তিনোকে উয়েফার আলটিমেটাম

বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার ফিফার প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে আলটিমেটাম দিয়েছে ইউরোপের ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা: হয় তিনি নিজে থেকে পদত্যাগ করবেন, নয়তো জরুরি অনাস্থা ভোটের মুখোমুখি হতে হবে।

ইনফান্তিনো স্বেচ্ছায় সরে না দাঁড়ালে উয়েফার ৫৫টি সদস্য দেশই অনাস্থা ভোটে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পক্ষে রায় দেবে। এমন একটি ভোটাভুটি ডাকার জন্য উয়েফার প্রয়োজন মাত্র ৪৩ সদস্য দেশের সমর্থন।

বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিশ্বকাপ ফুটবলের অংশীদারিত্ব বিক্রির পরিকল্পনা করেছিলেন ইনফান্তিনো। তুমুল বিরোধিতার মুখে সেই পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হওয়ার পর শনিবার (১ আগস্ট) সকালে ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানিয়ে দেয়, ইনফান্তিনোর ওপর তারা আস্থা হারিয়েছে। এখন তারা ইনফান্তিনোর পদত্যাগ চায়।

ফিফার অন্দরমহলেই ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ফিফার কর্মীরা এ বিদ্রোহের নাম দিয়েছেন ‘দানব বধ’ (কিল দ্য মনস্টার)। এমন পরিস্থিতির মাঝেই এল উয়েফার এই বিবৃতি।

উয়েফার এই অবস্থানকে তাৎক্ষণিকভাবে জোরালো সমর্থন জানিয়েছে ইংল্যান্ডের দ্য ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। তারা বলেছে: ‘আমরা উয়েফার অবস্থানকে পুরোপুরি সমর্থন করি। বিশ্বব্যাপী ফুটবল যেন স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালিত হয়, তা নিশ্চিত করতে ফিফার নেতৃত্ব ও শাসনব্যবস্থার একটি পূর্ণাঙ্গ ও কঠোর পর্যালোচনা এখন সময়ের দাবি।’

‘দায়ীদের জবাবদিহি করতেই হবে’

ফিফার শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তনের ডাক দিয়ে উয়েফা তাদের বিবৃতিতে বলেছে: ‘পর্দার আড়ালে থাকা কিছু মানুষের বানানো গোপন ছক আর তড়িঘড়ি তা বাস্তবায়নের এই নোংরা খেলা এভাবে চলতে পারে না। ফুটবলের আদৌ এতে কোনো লাভ আছে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। যারা এর নেপথ্যে আছে, তাদের খুঁজে বের করে জবাবদিহি করতেই হবে।

এতে আরও বলা হয়েছে, আগামী কয়েক দিন ও সপ্তাহে উয়েফা তার সদস্য অ্যাসোসিয়েশন ও অন্যান্য কনফেডারেশনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করবে। কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল, তা খতিয়ে দেখা হবে। ভবিষ্যতে যেন এর পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য পরিকল্পনাও প্রস্তুত করা হবে। ‘ফিফার বর্তমান নেতৃত্বের ওপর শুধু উয়েফার নয়, ফুটবল পরিবারের আরও অনেক সদস্যই আস্থাই হারিয়েছে।’

উয়েফার বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য ফিফার সদস্য সংগঠনের কাছে সমর্থন চাওয়ার সময় ইনফান্তিনো ‘স্টেকহোল্ডারদের বলেছিলেন, “ফিফার টাকা আপনাদেরই টাকা। এটা ফিফা সভাপতির পকেটের টাকা নয়। আপনারা জাতীয় অ্যাসোসিয়েশন, তাই ফিফার অর্থ কেবল ফুটবলের উন্নয়নের কাজেই ব্যবহার করতে হবে, অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নয়। এই দুটি প্রতিশ্রুতি পালনেই তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। আড়ালে বসে যে নোংরা আর অস্বচ্ছ চুক্তির ছক তিনি কষেছিলেন এবং তা জোর করে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, তার মধ্যে বিন্দুমাত্র স্বচ্ছতার ছিল না। তাছাড়া রিজার্ভ ফান্ডের পরিমাণ ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেলেও ফুটবলের বৃহত্তর স্বার্থে অ্যাসোসিয়েশনগুলোর এই বিপুল অর্থ কাজে লাগাতেও তিনি ব্যর্থ।’

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘বিদ্যমান ফিফা ফরোয়ার্ড কর্মসূচির মাধ্যমে কীভাবে নতুন করে সম্পদ বণ্টন করা যায়, সে ব্যাপারে বিশ্বজুড়ে ফুটবল অঙ্গনের অংশীদার ও স্টেকহোল্ডারদের সাথে নিয়ে উয়েফা এখনই কাজ শুরু করবে। ফিফার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অলস পড়ে থাকা ওই অর্থের কিছুটা আমাদের এখনই ব্যবহার করতে হবে। ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের প্রতিটিতে তৃণমূল পর্যায়ে এবং বৃহত্তর ফুটবলে যে গতির সঞ্চার করা প্রয়োজন, তার জন্যই এই অর্থ কাজে লাগাতে হবে। কিন্তু এর জন্য ঘরের সোনা-দানা বিক্রির দরকার নেই।

‘গোটা ফুটবল দুনিয়ার জন্যই এটি এক বিরাট জয়। তবে এখানেই গল্পের শেষ হতে দেওয়া যাবে না। প্রস্তাবটি বাতিল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ফিফার ওপর হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনার আসল কাজ সবে শুরু হয়েছে।’

বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বের ৩০ শতাংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা প্রকাশের পর থেকেই ফুটবল দুনিয়ার তোপের মুখে পড়েন ইনফান্তিনো।

এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ফিফার শীর্ষ স্তরের নারী ও পুরুষ ফুটবল প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক স্বার্থ চলে যেত একদল বিনিয়োগকারীর মুঠোয়।

ফুটবলের আত্মাকেই বিক্রি করে দেওয়ার চেষ্টা করছে ফিফা—এমন অভিযোগ তোলে উয়েফা। বৃহস্পতিবার উয়েফার ৫৫টি সদস্য দেশ বিশ্বকাপ বয়কটের পক্ষে ৫৫-০ ভোটে সর্বসম্মত রায় দেয়।

উয়েফার দেখানো পথে উত্তর ও মধ্য আমেরিকার কনকাকাফ-ভুক্ত দেশগুলোও বিশ্বকাপ বয়কটের ঘোষণা দেয়। তা সত্ত্বেও, শুক্রবার দিনের শুরুতে আগ্রাসী বিবৃতি দিয়ে ফিফা দাবি করে, তাদের পরিকল্পনা এগিয়ে যাবে। ‘ফুটবলকে বেচে দেওয়া হচ্ছে’—এমন অভিযোগও সরাসরি অস্বীকার করে তারা।

কিন্তু হিসাব পাল্টে যায় যখন এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দেয়। তারা বলে, ‘ফিফা বিশ্বকাপকে রক্ষা করতে উয়েফা ও কনকাকাফের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়বে’ তারা। এরপরই বিশ্বজুড়ে ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের মধ্যে ৫০ শতাংশের সমর্থন জোগাড় করতেও ব্যর্থ হন ইনফান্তিনো।

শুক্রবার এই বিদ্রোহ আরও ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বকাপের অংশীদারিত্ব বিক্রির পরিকল্পনার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন ইনফান্তিনোর সিনিয়র উপদেষ্টা কার্লোস কোর্ডেইরো। এর পরপরই ফিফার চিফ অপারেটিং অফিসার কেভিন লামুর ক্ষোভ বলেন, কর্মীদের সঙ্গে ‘প্রতারণা’ করেছেন ইনফান্তিনো।

রাজনৈতিক চাপও বাড়তে থাকে প্রবলভাবে। ইনফান্তিনোর পদত্যাগ দাবি করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। অন্যদিকে ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ মিত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, এই পরিকল্পনার ব্যাপারে তার সঙ্গে ফিফা প্রধানের কোনো আলোচনা হয়নি।

ফুটবল মহলে প্রভাবশালী রাজনৈতিক কৌশলবিদ আশিষ প্রশার ফিফা সভাপতিকে গদিচ্যুত করতে উয়েফার পদক্ষেপকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘নিজের পকেট ভারী করতে ফুটবলকে লুটপাট করে খেলাটির বারোটা বাজানোর প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিয়েছেন ইনফান্তিনো। একে শুধু থামালেই চলবে না, ভবিষ্যতে যেন এই নোংরা খেলা আর কখনও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। আর সেই কাজের শুরুটা হতে হবে ইনফান্তিনোকে সরানোর মধ্য দিয়েই।’- দ্য টেলিগ্রাফ