শেখ হাসিনা ফিরছেন। তিনি ফিরছেন জন্মভূমির চিরচেনা পথরেখায়। তাঁর এই ফিরে আসা নতুন কিছু নয়। প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে তিনি ফিরছেন। প্রতিবারই তাঁর ফেরার ল্যান্ডস্কেপ ছিল coercive power dynamics এর বৈরী বিন্যাস। তবু প্রতিবার ফেরার পথে তাঁর নেমেছিল জনতার ঢল— ছুটেছিল উদ্বেলিত অভিবাদন।
এবার তাঁর ফেরার দিকে তাকিয়ে আছে কি তেমনি প্রতীক্ষার চোখ? যেমন করে খরাচৌচির ধানের ক্ষেতে একটা গ্রাম আসমানের দিকে তুলে ধরে যূথবদ্ধ হাত — বৃষ্টির জন্য মোনাজাত।
এই চিত্রকল্পটা কি তেমনি একটি rhetorism নাকি বাস্তবিক চিত্র? সময় তা বলে দেবে। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে।
পঁচাত্তরে ঘটেছিল নৃশংস হত্যাকান্ডের এপিক ট্রাজেডি। দুনিয়ার তাবৎ ট্রাজেডির চাইতেও ভারি সেই রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি। শেক্সপিয়রের ট্রাজেডি মঞ্চকে সয়লাব করে রক্তে। বঙ্গবন্ধুর রক্তে ভেসেছিল রক্তনদী সারা বাংলাদেশ। সেদিন কিন্তু একজনও আলীগ, ছাত্রলীগ রাজপথে নামেনি। প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করেনি। ট্রাজেডির প্রতিশোধ-তাড়িত প্রোটাগনিস্টদের মতো একজনকেও পাওয়া যায়নি। কোথাও দেখা মেলেনি এস্কাইলাসের ওরেস্টিস— সোফোক্লিসের ইলেক্ট্রা — ইউরিপাইডিসের মিডিয়ার মতো প্রতিশোধ গ্রহণের তীব্রতা?
একমাত্র হাসিনার মধ্যে দেখা যায় ইলেক্ট্রার তেজ।
আমার মনে হয়, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের পথে নামবে না তাদের কেউই। তারা সবাই দুর্নীতিতে এতোটাই নিমজ্জিত হয়েছিল, তারা আজ সম্পূর্ণ জিমোরালাইজড। অনৈতিক রাজনৈতিক কর্মী ও নেতারা counterinsurgency বা গেরিলা যুদ্ধ করতে পারে না। তারা লুকিয়ে বাঁচতে চায় জীবন। সেটাই দৃশ্যমান হয়েছে অতিক্রান্ত দুবছর।
শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বৈপ্লবিক উন্নতির রূপকার। তিনি যুগপৎ একজন থিংকার এবং ডুয়ার। তিনি বাংলাদেশের ল্যান্ডস্কেপ নির্মাণ, বিনির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ করে চলেছিলেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার আদলে। সফলতার পথে এগিয়ে চলেছিলেন। বাংলাদেশকে তিনি বানাতে চেয়েছিলেন রেনেসাঁর ফ্লোরেন্স। বানাতে চেয়েছিলেন শিল্প, স্থাপত্য ও সৌন্দর্যের রাজধানী প্যারীর মতো আরেক প্রজ্ঞাপারমিতা নগরী ।
কিন্তু তাঁর নন্দন-নগরকে দখল করেছে একাত্তরে পরাজিত পরাশক্তি ও পাকিস্তানী হায়েনার দল। সেখানে তাঁর জন্য তৈরি হয়েছে ফাঁসির মঞ্চ— endgame vengeance.
এবার তিনি কোথায় ফিরবেন? তিনি কি ফিরবেন তাঁর corridors of retrospect এর নস্টালজিক মেমোরি লেনে? তিনি কি ফিরবেন দিল্লীর কারাগার থেকে ঢাকার কারাগারে? তিনি কি ফিরবেন বলপূর্বক নির্বাসনের অবরুদ্ধ জেলগেট খুলে জন্মভূমির জান্তব জেলখানায়? ফিরবেন স্বদেশের ডিস্টোপিয়ায়? কাটাবেন জীবনের শেষদিনগুলো একাত্তরে পরাজিত শত্রুর অর্গলে ও শেকলে, অন্তরীণ অন্ধকারে? বিস্রস্ত পা ফেলে দাঁড়াবেন ফাঁসির মঞ্চে?

এমন বৈরী দেশে কেনো তিনি ফিরতে চাইছেন? কেনো তাঁর এই সুইসাইডাল ডিসিশন? কারণ তিনি একা। নিজের মধ্যে আদিগন্ত বিস্তৃত নিঃসঙ্গ এক ক্লান্ত শেরপা। তিনি কতোটা একা, সেটা তিনি এরি মথ্যে জেনেছেন মর্মতলে।
তিনি এটাও জেনে গেছেন, ভারত তার জন্য কখনোই বিপুল মুনাফার বিশাল বাজার, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যাবে না।
পড়ন্ত ছুরি ধরার ঝুঁকি কেউ কি নিতে চায়?
সার্জিক্যাল স্ট্রাইক বলি আর মিলিটারি ইন্টারভেনশান বলি— ভারত এগুলো কখনোই করতে যাবে না। কারণ, বাংলাদেশ এখন এজেন্ট কান্ট্রি বা প্রক্সি কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। তার গায়ে হাত দিলেই ভারতের বুকে ছুটে যাবে তুরস্কের বায়রাকতার ড্রোন। পাকিস্তান ছুঁড়বে Fatah-II আর চীন এই সুযোগে তার আজন্ম শত্রু ভারতকে ফ্রাগমেন্টেড করে ছাড়বে। আমেরিকা তলে তলে সেই ভাঙনের রণতুর্য হয়ে মদদ যোগাবে।
জিওপলিটিক্সের এরিনায় পরাশক্তির শত্রুতা স্থির থাকে না; ডাইনামিকলি পাল্টায়। তারা সবাই চায় ভারত ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাক। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট এর পিতা Philip II of Macedon এর সেই “divide et impera“ বা divide and rule ডকট্রিনকে আমেরিকা চাইবে ভারতে ঘটাতে।
ভারত চাইবে না এমন কমপ্লেক্স ভূ-রাজনীতি ও প্রক্সি যুদ্ধের রণক্ষেত্রে আত্ম-ধ্বংসের দামামা বাজাতে। শেখ হাসিনার জন্য ভারত এসব ঘটাবে না।
পৃথিবীর কোনো দেশ নেই যারা শেখ হাসিনাকে পরাশক্তির বিরোধিতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জানাবে অভিবাদন। কোথাও নেই তার জন্য স্যাংচুয়ারি। যখন কোনো অভয়ারণ্য থাকেনা, তখন ডিস্টোপিয়ায় ফেরার স্পৃহা টানে।
মার্কিনীদের সমর্থন পেয়ে স্বদেশে ফিরতে হলে তাঁকে নত হতে হবে ডিপ স্টেটের কাছে। বানাতে হবে তাঁর প্রাণপ্রিয় স্বদেশকে প্রক্সি স্টেট থেকে Vassal স্টেট। “We all know that a small nation with a weak economy and deep socio-politico-religious polarization can easily fall into long-term servitude to a powerful suzerain.”
শেখ হাসিনা এ কথাটা জানেন ও বোঝেন। যে তিনি মার্কিনী হুমকি ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে নিজেকে রেখেছিলেন অনড় ইস্পাত। সেই তিনি কি তাদের কাছে হবেন প্রণতমস্তক?
তাঁকে মার্কিনী সমর্থন পেতে হলে বিএনপি, জামাত ও ইউনুছ যে পরিমাণ ছাড় দিয়েছে, তারও বেশি ছাড় তাঁকে দিতে হবে। সেটা কি দেবেন তিনি? আরো বেশি ছাড় দেয়ার স্পেস আছে কি বাকি?
তিনি হয়তো ভাবছেন বিএনপি সরকার এবং তাদের পেছনের দোসরশক্তি জামাতে ইশ্লামী জঙ্গীরা তাঁকে ফাঁসি দিতে পারবে না। ব্যাপারটা কিন্তু তেমন নয়। পরাজিত শত্রুরা প্রতিশোধ নিতে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে আসছে যুগের পর যুগ। তারা পঁচাত্তরে একটা বড় revenge নিতে পেরেছিল। একুশে অগাস্ট তাঁকে ও তাঁর দলকে নেতৃত্বশূন্য করতে চেয়েছিল। এবার তারা তাঁকে শুধু ক্ষমতাচ্যুৎ করেনি। তাঁকে forced exile এ পাঠিয়েছে। তারপর আলীগকে নিষিদ্ধ ও নিস্ক্রিয় করে দিয়েছে।
আলীগ কোথাও শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি গত দুবছরে। পর্যাপ্ত সময় পেরিয়েছে। শত্রুরা গোছগাছ করে শক্ত হয়ে উঠেছে। আলীগ counterinsurgency না করে লুকিয়েছে খন্ড খন্ড স্বরচিত গুহায়। তারা হয়েছে “rot from within” — তাদের পচন ধরেছে ভিতর থেকে। তারা আগের মতো করে কিছুই করতে পারবে না।
পাশাপাশি, বাংলাদেশে ঘটেছে জটিল সোসিও-পলিটিক্যাল পোলারাইজেশান। যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে একজনও ideological leadership নেই। সবাই রাজনৈতিক দালাল এর মতো হয়েছে সার্বভৌমত্ব পাচারকারী। তারা sovereignty trafficking করে চলেছে। মতাদর্শিক শূন্যতা বা ideological vacuum রাষ্ট্রীয় নৈতিকতাকে করেছে উধাও। যেখানে রাজনৈতিক কুশীলবরা কেবলই লুণ্ঠনমূলক ও লেনদেন-সর্বস্ব মানসিকতা নিয়ে কাজ করে চলেছে—অর্থাৎ তারা কোনো নীতিমালার ভিত্তিতে নয়, বরং স্বল্পমেয়াদী আর্থিক ও ক্ষমতার স্বার্থতাড়িত প্রণোদনা দ্বারা চালিত হয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করে চলেছে।
ঘটে চলেছে asymmetric polarization বা অসম মেরুকরণ। এই সবকিছুর সংঘাত কোনো সমকক্ষ দুটি আদর্শিক পক্ষের মধ্যে নয়; বরং এটি একটি কাঠামোগত বিভাজন। গণতান্ত্রিক সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশটি অসংগঠিত, অথচ ধর্মতান্ত্রিক সংখ্যালঘু অংশটি সহিংসতার মাধ্যমে অত্যন্ত সুসংহত। ধর্মতান্ত্রিক আগ্রাসন অর্থাৎ theocratic encroachment চলছে মহা দাপটের সঙ্গে। ধর্মীয় চরমপন্থীরা বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঢুকছে সহিংস অনুপ্রবেশ। যারা ভেতর থেকে ধর্মনিরপেক্ষ আইনি কাঠামোকে সুপরিকল্পিতভাবে ভেঙে ফেলছে। পরিস্থিতি labyrinthine অর্থাৎ গোলকধাঁধার মতো। এই মেরুকরণের বাংলাদেশে ফিরে তিনি কী করবেন— কী করতে পারবেন? যা পারবেন সেটা আদর্শহীনতার রাজনীতির গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খেতে খেতে তাদের হাতের পাপেট হয়ে পড়া।
শেখ হাসিনা, আপনি পারবেন না নেলসন ম্যান্ডেলার মতো “রেইনবো নেশন” পলিসি কার্যকর করতে। নেলসন ম্যান্ডেলার “রেইনবো নেশন” ধারণাটি গৃহযুদ্ধ প্রতিরোধ ও বর্ণবাদের অবসানের ক্ষেত্রে একটি বড় রাজনৈতিক সাফল্য হলেও, চরম দারিদ্র্য ও জাতিগত বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে এটি ছিল অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ব্যর্থ।
মূল্যবোধবর্জিত বাংলাদেশে কোনো ভ্যাল্যুজ ও নীতি আদর্শের রাজনীতি চলবে না। পরাশক্তির দাসত্ব শৃঙ্খলে রাজনীতির জেলখানায় রাজনৈতিক আত্মহনন করার চাইতে নির্বাসিত জীবনে হারিয়ে যাওয়া অনেক ভালো।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি এই সুপার কমপ্লেক্স পোলারাইজড দেশে কিছুই করতে পারবেন না। যা পারবেন, শক্তি দিয়ে শাসন করতে। শক্তিশাসন যে কাজ করবে না সেটা তো দেখেছেন। তাহলে তার পুনরাবৃত্তি করে কী লাভ, কাদের লাভ? সবশেষে, তবু বলতে হয়, Bangladesh deserves a visionary leadership—not a labyrinth of religious, social, and political polarization















