নিউইয়র্ক     শনিবার, ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ  | ১১ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

হাসনাত ভাইকে মনে পড়ে

আদনান সৈয়দ

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২২ | ০২:৪৭ অপরাহ্ণ | আপডেট: ০৫ নভেম্বর ২০২২ | ০২:৪৭ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
হাসনাত ভাইকে মনে পড়ে

সম্পাদক, কবি, প্রাবন্ধিক আবুল হাসনাত ভাইয়ের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে খুব মনে পড়ছে। দু বছর আগে তাঁর মৃত্যুর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে ধানমন্ডির ক্রিমসনে আমরা এক সঙ্গে কফিযোগে আড্ডা দিয়েছিলাম। সেই আড্ডায় আমাদের সঙ্গে অনুবাদক রওশন জামিলও ছিলেন। সেই ছিল তাঁর সঙ্গে আমার শেষ দেখা। অসাধারণ একজন মানুষ ছিলেন হাসনাত ভাই। নিজেকে গুটিয়ে রাখতেই তিনি বেশি ভালোবাসতেন। এই প্রচারের যুগে এমন বিনয়ী মানুষের সংখ্যা খুব একটা আছে কি?

সম্পাদক হিসেবেই তাঁর নাম বেশি উচ্চারিত অথচ তিনি মাহমুদ আল জামান ছদ্মনামে শিল্প সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণ করেছেন। তাঁর রয়েছে অসাধারণ কিছু শিশুসাহিত্য, মুক্তিযুদ্ধ, স্মৃতিকথা, এবং শিল্প সাহিত্যের নানা বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ। কিশােরদের নিয়ে তাঁর চারটি উপন্যাস ও তিনটি জীবনীগ্রন্থ বিশেষভাবে সমাদৃত । মুক্তিযুদ্ধের গল্প ও কবিতাসহ সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা পনেরো। চিত্রকলা নিয়েও তিনি বিভিন্ন সাময়িকীতে নিয়মিত লিখেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হল: ইস্টিমার সিটি দিয়ে যায়, কিশোর সমগ্র, রবীন্দ্রনাথঃ চিত্রকর, যুদ্ধ দিনে ধূসর দুপুর, কবিতা সমগ্র, নির্বাচিত কবিতা, কোন একদিন ভুবনডাঙায়, জোৎস্না ও দুর্বিপাক, চ্যার্লি চ্যাম্পলিন। শিশু ও কিশোরদের জন্যে তাঁর রচিত অন্যান্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘টুকু ও সমুদ্রের গল্প’, ‘যুদ্ধদিনের ধূসর দুপুরে’, ‘রানুর দুঃখ -ভালোবাসা’র নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। কেন জানি মনে হয় তাঁর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পাদনার ভারি শব্দের নিচে চাপা পড়ে গেছে। হাসনাত ভাই দুবছর হয়ে গেল এই ইহ জগতে নেই। কিন্তু তাঁর কাজগুলো রয়ে গেছে। তাঁর কাজের মধ্য দিয়েই তিনি বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকবেন।

লেখক এবং সম্পাদক আবুল হাসনতাকে চিনেছিলাম আমার দুরন্ত কৈশোরে। তবে আবুল হাসনাত নামে নয় ভীন্ন এক নামে অর্থাৎ মাহমুদ আল জামান নামে। অনেক পরে আবিস্কার করেছিলাম এই মাহমুদ আল জামানই বিখ্যাত লেখক এবং সম্পাদক আবুল হাসনাত। মাহমুদ আল জামান নামে তিনি শিশুদের জন্যে লিখতেন। কবিতা এবং অনুবাদও তিনি এই নামে করেছেন। এই নামটি ছিল তাঁর ছদ্মনাম। শিশু কিশোরদের জন্যে লেখা তাঁর চমকপ্রদ একটি গ্রন্থ ‘ইস্টিমার সিটি দিয়ে যায়’ এবং সেই গ্রন্থের লেখক মাহমুদ আল জামানের নামটি আমার কৈশরের ধূলবালী মাখা স্মৃতিপটে সবসময়ই যুক্ত হয়ে আছে।

তারপর আবুল হাসনাতকে আবিস্কার করেছিলাম দৈনিক সংবাদ এর সাহিত্য পাতার সম্পাদক হিসেবে। পত্রিকাটির সাহিত্য পাতার তখন আমি ছিলাম এক নিষ্ঠ ভক্ত। আহা! সেই পাতাটি যেন শিল্প সাহিত্যের সোনা-রূপা দিয়ে মোড়ানো ছিল। প্রতি সপ্তাহে অপেক্ষায় থাকতাম কখন পত্রিকাটি হাতের নাগালে এসে ধরা দিবে। পত্রিকাটির প্রতি পারিবারিক দূর্বলতার কারণেও এই পত্রিকাটির সাহিত্য পাতাটি হয়ে উঠেছিল আমার শিল্প-সাহিত্যের আত্মার খোরাক। বলার অপেক্ষা রাখে না প্রায় চারদশক ধরে তিনি সেই সাহিত্য পাতাটি শুধু সম্পাদনাই করেননি পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশে একটি বিদগ্ধ পাঠক এবং লেখক সমাজ নির্মাণও করেছিলেন।

তারপর আরো বড় হয়ে অবাক চোখে আবিস্কার করি লেখক এবং সম্পাদক আবুল হাসনাতকে তাঁর সুসম্পাদিত শিল্প সাহিত্যের পত্রিকা ‘কালি ও কলম’এর মাধ্যমে। আমি তখন কালি ও কলমের শুধুমাত্র একজন পাঠক নই, পত্রিকাটিতে লেখালেখির সঙ্গেও যুক্ত! সত্যি! এই আত্মশ্লাঘা একজন লেখকের জন্য কোন অংশেই কম নয়! কালি ও কলমে লেখার সূত্র ধরেই সম্পাদক এবং লেখক আবুল হাসনাতের সঙ্গে আমার একটি আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তিনি তখন হয়ে উঠলেন আমার প্রিয় মানুষদের একজন। তাঁকে ডাকি ‘হাসনাত ভাই’। সেই থেকেই শুরু। যেহেতু আমি থাকি বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে তাই ঢাকায় মাঝে মাঝে বেড়াতে গেলে হাসনাত ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হবে তা ছিল নিশ্চিত। তাঁর সান্নিধ্যে খুঁজে পেতাম একজন নিপাট বন্ধুত্বের স্বাদ, তাঁর সৌম্য মুখখানায় খুঁজে পেতাম পৃতৃত্বের ছোঁয়া।

তাঁর কথা স্মরণ হলেই শুধু মনে হয় এমন মানুষও পৃথিবীতে জন্মে! এত নির্মোহ, ভদ্র এবং অমায়িক মানুষ এবং সম্পাদক আমি আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে সত্যি খুব বেশি একটি দেখিনি। মানুষতো নন যেন সাক্ষাৎ দেবতা! নিজেকে গুটিপোকার মত গুটিয়ে রেখে আড়াল করে রাখতে তাঁর কতই না চেষ্টা! বর্তমান এই ডিজিটাল দুনিয়ায় মানুষ যখন উলঙ্গভাবে ঢাক ঢোল পিটিয়ে নিজেই নিজের আত্মপ্রচারে নেমেছে তখন আমরা সম্পাদক আবুল হাসনাত এর জীবন থেকে কিছু শিক্ষা পেতে পারি বৈকি!

লেখক এবং সম্পাদক আবুল হাসনাত এর সঙ্গে ঠিক কবে এবং কখন আমার পরিচয় ঘটেছিল তা বলা কঠিন। তবে স্পষ্ট মনে আছে ২০০৭ সালের জুন জুলাই মাসে খুব কাকতালীয়ভাবে ওঁর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। আমি তখন নিউইয়র্কে বসবাসরত কবি শহীদ কাদরীর সঙ্গে নিয়মিত আড্ডা দেই। তাঁর সঙ্গে তখন আমার বেশ অন্তরঙ্গ সময় চলছে! কবি শহীদ কাদরীর সঙ্গে সেই সময়টা ছিল তখন আ্ড্ডা, কবিতা আর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তর্কাতর্কি, কাটাকাটি আর মাখামাখি করার সময়। তখনকার সেই সময়ে নিউইয়র্কের কঠিন পাথুরে মাটিতে কবি শহীদ কাদরীর সঙ্গে আড্ডা ছিল আমার জন্য মরুভুমিতে একটি মরুদ্যান খুজে পাওয়ার মতই ঘটনা। সোমবার থেকে শুক্রবার অফিসের বারন্দা পেড়িয়ে শনি আর রবিবার ছুটির দিনে কবি শহীদ কাদরীর বাড়িতে চলতো আমাদের বেহিসেবি আড্ডা। সেই আড্ডার ফসল হিসেবেই একদিন মনে হল কবি শহীদ কাদরীর কবিতা নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখলে কেমন হয়! ভাবনাটা মাথায় আসতেই “ শহীদ কাদরী ও তাঁর কবিতা’ এই নিয়ে বড় একটি প্রবন্ধ লিখে ফেলি এবং কিছু না ভেবেই লেখাটি ইমেলে পাঠিয়ে দেই কালি ও কলম সম্পাদক বরাবর। তারপর অপেক্ষার পালা। আমার মত অচেনা এক লেখকের লেখা পেয়ে বিখ্যাত সম্পাদক/লেখক কি ভাববেন, কি হবে না হবে এসব ভাবনাগুলো কল্পনার সূতো দিয়ে মালা গাঁথা ছাড়া তখন আমার কিইবা করার ছিল! এক সন্ধ্যায় সেই কাংখিত চিঠির উত্তর এল। খুল অল্প কয়েকটা লাইন। কিন্তু সেই অল্প কয়েকটি শব্দে আমি কল্পনায় দেখতে পেয়েছিলাম আপাদমস্তক নিপাট এক ভদ্রলোকের মুখ। জানালোন আগামী সংখ্যায় আমার ‘শহীদ কাদরী ও তাঁর কবিতা ’ প্রকাশিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে চিঠিতে ছোট একটি অনুরোধও রাখলেন। ‘যদি সম্ভব হয় শহীদ কাদরীর নতুন কোন কবিতা এবং তাঁর একটি সাক্ষাৎকার কালি ও কলমের জন্যে পাঠিয়ে দিবেন।’ তাঁর চিঠির প্রতিটা শব্দে এত বিনয়মাখা ছিল যে তখন লোকটাকে সামনাসামনি দেখার লোভ সামলানো কঠিন হয়ে গেল। বলা যায় সেই থেকে শুরু। কালি ও কলমে শহীদ কাদরীর নতুন কবিতা, তাঁর সাক্ষাৎকার, তাঁর কবিতারে উপর প্রবন্ধ নিয়ে নিত্যই কালি ও কলমের দরজায় টোকা দেই। সেই থেকেই শুরু। হাসনাত ভাই তাঁর কালি ও কলমের দরজাটি আমার জন্যে শুধু উন্মোক্ত করে দিয়েছিলেন। আপনারা হয়তো জানেন কবি শহীদ কাদরীকে তিনি অসম্ভব ভালো বাসতেন, শ্রদ্ধা করতেন। শহীদ কাদরীও আবুল হাসনাত বলতে পাগল ছিলেন। তাঁরা পরস্পর ছিলেন বন্ধু। তারপর কতগুলো বছর! কত গল্প আর জীবনের কত গান!

আমি সবসময়ই লেখক ও সম্পাদক আবুল হাসনাতকে তুলনা করি ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষ, পয়েট্রি পত্রিকার সম্পাদক মনরো, কবিতা পত্রিাকর সম্পাদক বুদ্ধদেব বসুর মত লেখক এবং সম্পাদকদের সঙ্গে। সম্পাদক হিসেবে তাঁর ছিল জহুরী চোখ। একজন সফল সম্পাদক যেভাবে নিত্য নতুন লেখক আবিস্কার করতেন আবুল হাসনতাও ছিলেন ঠিক তাই। নতুন লেখক এবং শিল্প সাহিত্যের নতুন নতুন ভাবনা তিনি তাঁর পত্রিকার পাতায় গুরুত্বের সঙ্গেই স্থান দিতেন। তাঁর পত্রিকাকে ঘিরে তৈরি হত একটি শিক্ষিত বিদ্বৎ সমাজও।

হায়! এভাবেই বুঝি মানুষ স্মৃতি হয়ে যায়! এভাবেই বুঝি আলো ঝলমলে রদ্দুরে হাটা একটি মানুষ হঠাৎ করে ছায়ার মত অন্ধকারে হেটে চলে যান ! কে জানতো তাঁর সঙ্গে আর কোনদিন দেখা হবে না! তিনি কি তাঁর এই বিদায়ের ঘন্টাটিও শুনতে পেরেছিলেন! মৃত্যুর কয়েকদিন আগে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর আত্মজীবনীমুলক গ্রন্থ ‘হাড়ানো সিঁড়ির চাবির খোঁজে’। হাসনাত ভাই সেই চাবির খোঁজে নিজেইে এমন সহসা ডুব দিবেন সে কথা কে জানতো?

‘ইস্টিমার সিটি দিয়ে যায়’! হেমন্তের এক কুয়াশাঘন রাতে লেখক ও সম্পাদক আবুল হাসনাত নিজেও এভাবে সিটি দিতে দিতে দিব্যি চলে গেলেন? তাও আবার বছর দুই গড়িয়ে গেল! মার্ক টোয়েন যথার্থই বলেছিলেন।

“I do not fear death. I had been dead for billions and billions of years before I was born, and had not suffered the slightest inconvenience from it.”

আবুল হাসনাতের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে গভীরভাবে স্মরণ করছি। নিউ ইয়র্ক নভেম্বর ২০২২

শেয়ার করুন