নিউইয়র্ক     শনিবার, ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ  | ১১ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

সংশোধিত বই পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা

বাংলাদেশ ডেস্ক

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৩ | ০৪:৫১ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: ০৪ মে ২০২৩ | ০৪:৫১ পূর্বাহ্ণ

ফলো করুন-
সংশোধিত বই পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা

পাঠ্যপুস্তক। ছবি: সংগৃহীত

চলতি বছর তিনটি শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হলেও নানা ভুলত্রুটি ও অসঙ্গতি নিয়ে বেশ চাপের মুখে পড়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এসব ভুলের সংশোধনী দিয়ে সম্প্রতি ছয়টি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু সঠিক তথ্য সংবলিত সংশোধিত কোনো বই বা কোনো শিট বিতরণ করা হবে না ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে।

সারা দেশের প্রতিষ্ঠান প্রধানদের উদ্দেশে সম্প্রতি এনসিটিবির জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পাঠ্যপুস্তকের ভুলের এই সংশোধনীগুলো সংশ্লিষ্ট শ্রেণি শিক্ষকের মাধ্যমে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পাঠ্যপুস্তকে সংযোজন করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ফরহাদুল ইসলাম বলেন, সংশোধনীর বিষয়গুলো আমরা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অধিদপ্তরকে জানিয়েছি। এই অধিদপ্তরগুলোর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধানের কাছে সংশোধনীগুলো পৌঁছে গেছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে ছাত্র-ছাত্রীদের বইয়ের এসব ভুলের সংশোধন করে দেবেন।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, সংশোধিত বই বা শিট ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিতরণ করা না হলে এই সংশোধনী কোনো কাজে আসবে না। কারণ শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকরা যথাযথভাবে এই সংশোধনীর নির্দেশনা দিতে পারবেন না। এ ছাড়া শিক্ষার্থীরাও ক্লাসরুমে থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে এই সংশোধন করে নেবে না। এনসিটিবির ওয়েবসাইটে সংশোধনী প্রকাশ করা হয়েছে, কিন্তু এই ওয়েবসাইট দেখে দেখে শিক্ষার্থীরা পড়বে না বলেও মত দেন শিক্ষাবিদরা। এছাড়া আগামী বছর আগেভাগেই পাঠ্যবই দিতে গিয়ে ফের ভুল হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, এসব সংশোধনী লোক দেখানো, প্রচারণা মাত্র। এগুলো বাস্তবে কোনো কাজে আসবে না। কারণ সংশোধিত বই না দিলে ছাত্র-ছাত্রীরা পড়বে কী? শ্রেণি শিক্ষকরা সংশোধনী দেখে দেখে মিলিয়ে মিলিয়ে তো পড়াবেন না। জোড়াতালি দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থায় এখন জগাখিচুড়ি পরিস্থিতি চলছে। এভাবে শিক্ষা চলে না। এই শিক্ষাবিদ আরও বলেন, ভবিষ্যতে পাঠ্যবইয়ে এমন ভুল যেন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

যোগ্য ব্যক্তিকে দিয়ে বই লেখানোর কাজ করতে হবে। পুরো কারিকুলাম চালু করে নির্ভৃল বই লিখতে হবে। আংশিক চালু করে নির্ভুল বই লেখা সম্ভব হবে না বলে মত দেন তিনি।

এনসিটিবি সূত্র জানায়, এ বছর নতুন শিক্ষাক্রমের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির ২২টি বইয়ের ৪২১টি ভুলভ্রান্তি ও অসঙ্গতির তথ্য প্রকাশ করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। আগামী বছর দ্বিতীয়, তৃতীয়, অষ্টম ও নবম এই চার শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রমের পাঠ্যবই যুক্ত হবে। তবে এ বছরের মতো যাতে বিতর্কের মধ্যে পড়তে না হয়, এজন্য বইগুলো বারবার দেখা হচ্ছে। আর এ বছর দেওয়া বইগুলোও কয়েকটি পর্যায় শেষে প্রয়োজনীয় পরিমার্জনের কাজ শেষ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আগামী বছরের শুরুতে বা এ বছরের শেষ নাগাদ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের সময় স্কুলগুলো ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আবার নির্বাচন উপলক্ষে পোস্টার, লিফলেট ছাপতে ছাপাখানাগুলোও ব্যস্ত থাকে। তাই পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে যেন নির্বাচনী কোনো কাজে জটিলতা সৃষ্টি না হয়, এজন্য আগেভাগে পাঠ্যবই ছাপার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অক্টোবরের মধ্যে বই ছাপা শেষে স্কুলে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য দরপত্র আহ্বান ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মো. মশিউজ্জামান বলেন, ‘নতুন শিক্ষাক্রমের বই পরিমার্জনের জন্য আমরা পুরো মার্চ মাসব্যাপী কাজ করেছি। ২৬ জেলার ৫৩ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফিডব্যাক নেওয়া হয়েছে। ২০ থেকে ২২ মার্চ একেকটি বিষয় নিয়ে ছয়জনের বিশেষজ্ঞ টিম কাজ করেছে। আমাদের বইয়ের লেখকরা ১৫ থেকে ২০ মার্চ তার আশপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভিজিট করে রিভিউ দিয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটিও তাদের রিপোর্ট দিয়েছে। এই সবকিছু নিয়ে আমাদের ২৭ থেকে ৩১ মার্চ আবাসিক কর্মশালা করে পরিমার্জনের কাজ শেষ করেছি। এরপর সম্পাদনা বিভাগের কাজও শেষ হয়েছে। অর্থাৎ আমাদের পরিমার্জনের কাজ শেষ।’

তিনি আরও বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটি যে সংশোধন করেছে তা মে মাসের প্রথম সপ্তাহেই স্কুলে স্কুলে পাঠানো হবে। শিক্ষকরা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকটি বই সংশোধন করে দেবেন। আর আগামী বছর আরও চারটি শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম যুক্ত হবে। তবে আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ের কাজ অক্টোবরের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে এনসিটিবি।’

জানা যায়, গত বছর নতুন শিক্ষাক্রমের বইয়ের কাজ শেষ করতে দেরি হওয়ায় ও দফায় দফায় কাগজের দাম বাড়ায় কাজ শেষ করতে দেরি হয়। এমনকি সব বইয়ের কাজ শেষ করতে গত মার্চ পর্যন্ত সময় লেগে যায়। আর তাড়াহুড়ো করে কাজ করায় নিম্নমানের কাগজের বই গছিয়ে দেন মুদ্রাকররা। শেষ সময়ে অনেকটা জেনেশুনেও চুপ থাকতে বাধ্য হয় এনসিটিবি। কিন্তু এবার যাতে গত বছরের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সেজন্য আগেভাগেই শুরু হয়েছে বইয়ের কাজ। আর নির্বাচনী বছর সরকারও যাতে কোনো বিতর্কের মধ্যে না পড়ে সে বিষয়টিও মাথায় রাখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রথম, চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণির দরপত্র উন্মুক্তও করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, গত বছরের মতো এ বছরও প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৩৪ কোটি বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপা হচ্ছে। তবে গত বছর যেহেতু মাধ্যমিকের চেয়ে প্রাথমিকের বই ছাপতে বেশি দেরি হয়েছিল, তাই এবার আগে প্রাথমিকের দরপত্র প্রক্রিয়ার কাজ শুরু হয়েছে। তবে আগের মতো এবারও কয়েকজন বড় মুদ্রাকর ও এনসিটিবির একটি সিন্ডিকেট যোগসাজশ করে দরপত্রে অংশ নেওয়া শুরু করেছেন। এতে নির্বাচনের বছরও সঠিক মানের বই পাওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। সূত্র : সাম্প্রতিক দেশকাল

নাছরিন/পরিচয়

শেয়ার করুন