নিউইয়র্ক     সোমবার, ২০শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ  | ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

শিনজো আবে’র রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নিয়ে কেন এত আলোচনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ

ফলো করুন-
শিনজো আবে’র রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নিয়ে কেন এত আলোচনা

এক সপ্তাহ আগেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রধানরা বৃটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিলেন। এবার তাদের অনেকেই বিশ্বের আরেক প্রান্ত জাপানে গেলেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে’র রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে। এ থেকে বিশ্বে শিনজো আবে’র প্রভাব সম্পর্কে ধারণা করা যায়। যদিও খোদ জাপানেই এই রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্ট্রিক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে।

বিবিসি জানিয়েছে, এতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১১.৪ মিলিয়ন ডলার। ফলে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই এর বিরোধিতাকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। জনমত জরিপ বলছে, বেশিরভাগ জাপানিই রাষ্ট্রীয় অর্থে এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া আয়োজনের বিরুদ্ধে। এ সপ্তাহের প্রথম দিকে রাজধানী টোকিওতে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সামনে এক প্রতিবাদকারী নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন। এছাড়া অন্তত ১০ হাজার বিক্ষোভকারী এই অন্ত্যেষ্ট্রিক্রিয়া বাতিলের দাবিতে রাজধানীর রাস্তাগুলো দিয়ে মিছিল করেছেন।

তবে অপর দিকে বিশ্ব নেতারা জাপান পৌঁছেছেন শিনজো আবে’র প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এতে উপস্থিত থাকতে পারছেন না। তবে তার স্থানে যোগ দিয়েছেন ভাইস-প্রেসিডেন্ট কমালা হ্যারিস।

যোগ দিয়েছেন সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুং। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ জাপান গিয়েছেন তার তিন পূর্ববর্তী প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে। এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রানী এলিজাবেথের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় না গেলেও জাপান গেছেন শিনজো আবে’র প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে।

যেখানে নিজ দেশেই এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে সেখানে বিশ্ব নেতারা কেনো এত আগ্রহী হয়ে উঠেছেন সাবেক এক প্রধানমন্ত্রীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে? মূলত জাপানে রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এগুলো সাধারণত রাজ পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর পর আয়োজিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শুধুমাত্র একবারই এরকম রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া আয়োজিত হয়েছিল, তাও ১৯৬৭ সালে। তাই দেশটিতে এমন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া আয়োজন একটি বড় বিষয় বলেই বিবেচিত হয়।

জনমত জরিপ বলছে, তিনি কখনো দেশের মধ্যে ‘অত্যাধিক’ জনপ্রিয় ছিলেন না। আর এ কারণেই তার জন্য রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন অনেকেই মেনে নিতে পারছে না। তবে জাপানের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে শিনজো’র ব্যাপক অবদান অস্বীকার করা অসম্ভব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তার থেকে বেশি সময় কেউ জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেননি। তাছাড়া তার মতো এত প্রভাব বিস্তারকারী শাসকও ছিল না কেউ। দেশে ও দেশের বাইরে তার প্রভাব ছিল অনন্য।

এ নিয়ে শিনজো আবে’র সাবেক উপদেষ্টা প্রফেসর কাজুতো সুজুকি বলেন, তিনি ছিলেন তার সময়ের তুলনায় অনেক এগিয়ে। তিনি ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তন বুঝতে পারতেন। চীনের উত্থান কীভাবে এ অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেবে তা আবে ভাল করেই জানতেন। তাই তিনি নেতৃত্ব ধরে রাখতে চাইতেন। তিনি কোয়াড গঠনের প্রধান ভূমিকায় ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও অস্ট্রেলিয়াকে সঙ্গে নিয়ে জাপান এ অঞ্চলে চীনকে মোকাবেলায় নামে।

শিনজো আবে জাপানের সামরিক দিকগুলোতেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন। ২০১৪ সালে তিনি জাপানের যুদ্ধ বিষয়ক সংবিধানে পরিবর্তন আনেন তিনি। এরফলে জাপান যৌথভাবে সামরিক মহড়া করার সুযোগ পায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম বারের মতো জাপান তার সীমানার বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক মহড়া করে তখন। এই সংবিধান পরিবর্তন নিয়ে জাপানে সেসময় ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। এমনকি আজকের দিনেও সেই আলোচনা থেকে গেছে। যারা শিনজো’র রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার বিরোধিতা করছেন তারাও অভিযোগ করেছেন যে, তিনি জাপানকে যুদ্ধের দিকে নিয়ে গেছেন।

এক বিক্ষোভকারী বলেন, শিনজো আবে ‘কালেক্টিভ ডিফেন্স বিল’ প্রবর্তন করেছেন। এর মানে হচ্ছে, জাপান এখন আমেরিকানদের সঙ্গে মিলে যুদ্ধ করবে। এ কারণেই আমি তার রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার বিরোধী। জাপানের মানুষ যুদ্ধ ভয় পায়। বিশ্বের একমাত্র দেশ জাপান যেখানে পরমাণু বোমার ব্যবহার হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের নতুন সংবিধানে স্পষ্ট করে লেখা ছিল, জাপান কোনো যুদ্ধে যোগ দেবে না। শিনজো আবে এই সংবিধান পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটি করতে হলে তাকে গণভোটের দিকে যেতে হতো এবং তিনি জানতেন, গণভোট হলে তিনি হেরে যাবেন। তাই শিনজো আবে সংবিধানের ওই ধারার অর্থই বদলে দিয়েছেন।

টোকিওর সোফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর কোইচি নাকানো বলেন, আবে দেশের মানুষের কাছে দায়বদ্ধ ছিলেন না। তিনি যা করেছেন তা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি গণতন্ত্রের মূল ধারণার বিরুদ্ধে গিয়েছেন। যদিও আবে’র সমর্থকরা মনে করেন, তিনি ভবিষ্যৎ বুঝতে পারছিলেন। তাই চীনের হুমকি মোকাবেলায় জাপানকে প্রস্তুত করা প্রয়োজন ছিল। আবে’র উপদেষ্টা সুজুকির দাবি, আবে জানতেন যে চীনের উত্থান হলে আমেরিকা এ অঞ্চল থেকে পিছু হটতে বাধ্য হবে। যুক্তরাষ্ট্রকে তাই এ অঞ্চলে ধরে রাখতে তিনি নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির উপরে জোর দিয়েছিলেন। চীনকে নিয়ে উদ্বিগ্ন সকল দেশই এখন জাপানের সামরিকিকরণকে সমর্থন করে।

তার উদ্যোগে গঠিত কোয়াডের নেতাদের কাছে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। আবে’কে হত্যা করার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশে শোক ঘোষণা করেছিলেন। অপরদিকে চীনের কাছে আবে ছিলেন সবসময়ই নিন্দিত। তাই রানী এলিজাবেথের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় চীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়াং কিশানকে পাঠালেও, আবে’র অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় পাঠিয়েছে সাবেক এক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রীকে।

পরিচয়/সোহেল

শেয়ার করুন