নিউইয়র্ক     বৃহস্পতিবার, ১৩ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ  | ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশল বদলেছে রাশিয়া?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২২ | ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০২২ | ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ

ফলো করুন-
যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশল বদলেছে রাশিয়া?

ক্রিমিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার সংযোগকারী সেতুতে বিস্ফোরণের ঘটনার পর ইউক্রেনজুড়ে বড় ধরনের হামলা শুরু করেছে রাশিয়া। রাজধানী কিয়েভসহ বড় শহরে গত দুইদিনে প্রায় একশ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলো লক্ষ্য করে বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। ফলে অনেক এলাকা বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েছে। পানি সরবরাহ ও ঘর গরম রাখার ব্যবস্থাও অচল হয়ে গেছে।

গত কয়েক মাসে রাশিয়ার দখল করা অনেক এলাকা থেকে রুশ বাহিনীকে হটিয়ে দিয়েছে ইউক্রেনের সৈন্যরা। ফলে তিন লাখ সৈন্যের রিজার্ভ তলব করেছে রাশিয়া। অপরদিকে ইউক্রেনকে আরও সামরিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এমন প্রেক্ষাপটে ইউক্রেনজুড়ে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালাচ্ছে রুশ বাহিনী।

ইউক্রেন যুদ্ধে কি কৌশল নিচ্ছে রাশিয়া?

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেনজুড়ে এভাবে ব্যাপক হামলার ঘটনা গত কয়েক মাসে দেখা যায়নি। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে যখন রাশিয়া প্রথম ইউক্রেনে হামলা শুরু করে তখন কিয়েভের আশেপাশের এলাকায় এ ধরনের হামলা চালানো হয়। কিন্তু পরবর্তীতে কিয়েভ থেকে রাশিয়া সেনা প্রত্যাহারের পর মূলত পূর্বাঞ্চলীয় এলাকাগুলো দখলে রাখতেই রাশিয়া মনোনিবেশ করেছিল। কিন্তু ক্রিমিয়ার সঙ্গে রাশিয়াকে সংযোগকারী সেতুতে বিস্ফোরণের ঘটনার পর রাশিয়া আবার হামলা শুরু করেছে।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানিয়েছেন, তিনিই এসব হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ওই সেতুতে বিস্ফোরণের জন্য ইউক্রেনকেই দায়ী করেছেন এবং বলেছেন প্রতিশোধ হিসেবেই এসব ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন ইউক্রেনজুড়ে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালালেও রাশিয়া ইউক্রেনে পুরাদস্তুর সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছে না। রাশিয়া হয়তো ইউক্রেন ও পশ্চিমা দেশগুলোকে বার্তা দিতে চাইছে।

রাশিয়া প্রথমে কিয়েভে আক্রমণ চালিয়ে ইউক্রেনে সরকার পাল্টে দেয়ার চেষ্টা করেছিল। সেই সঙ্গে তাদের উদ্দেশ্য ছিল দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক দখল করে নেওয়া এবং দক্ষিণের কিছু এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। তারা কিয়েভ বা উত্তরের এলাকায় সাফল্য পায়নি কিন্তু পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণাঞ্চলে কিছুটা সফলতা পেয়েছিল। কিন্তু গত ছয় থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে ন্যাটোর ব্যাপক সমর্থনপুষ্ট হয়ে ইউক্রেনীয় বাহিনী পাল্টা আক্রমণ করে রুশ বাহিনীকে অনেকটা হটিয়ে দিতে পেরেছে।

রাশিয়ার দখলে ছিল এমন প্রায় ১৫ শতাংশ এলাকা ইউক্রেনীয় বাহিনী ফের পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে। তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো তারা ক্রিমিয়া উপদ্বীপকে গাড়ি বোমা হামলা করে রুশ ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পেরেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিমান হামলার মাধ্যমে রাশিয়া ইউক্রেনীয়দের বুঝিয়ে দিতে চাইছে যে যুদ্ধ এখানেই আপাতত তোমরা ঠেকিয়ে রাখো। বেশি বাড়াবাড়ি করলে পাল্টা আক্রমণ করার সম্ভাবনা ও সামর্থ্য রাশিয়ার রয়েছে। ইউক্রেন ও ন্যাটোকে সেটা রাশিয়া পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিতে চাইছে।’

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, রাশিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে বেশ কিছু সমস্যায় পড়েছে। ইউক্রেনীয়রা সাফল্য পেতে থাকলে, রাশিয়া ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণে যেসব এলাকা দখল করেছে সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা তাদের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়তে পারে। ইস্তাম্বুলভিত্তিক সমর বিশেষজ্ঞ এবং অধ্যাপক মুরাত আসলান বলেন, এসব হামলার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট পুতিন রাশিয়ার জনগণের কাছেও প্রমাণ করতে চান যে, তিনি রাশিয়ার স্বার্থকে রক্ষা করতে সক্ষম।

ক্রিমিয়ান সেতুতে হামলায় এটা প্রমাণ হয়েছে যে, রাশিয়ার সৈন্যরা দেশকে বাইরের হামলা থেকে পুরোপুরি রক্ষা করতে পারছে না। ফলে তিনি নিজের দেশের জনগণকে জানাতে চান যে, রাশিয়ার ওপর হামলা হলে তারা শক্ত পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। সেই সঙ্গে রাশিয়া ইউক্রেনের শীর্ষ নেতৃত্বকে এই বার্তাও দিতে চায় যে, তারা কোনভাবেই তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা মেনে নেবে না।

রিজার্ভ সৈন্য কতটা কাজে আসবে রাশিয়ার

ধারণা করা হয়, রাশিয়া তাদের প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার নিয়মিত সৈন্য ইউক্রেনে যুদ্ধের জন্য মোতায়েন করেছে। কিন্তু ইউক্রেনের যুদ্ধে রুশ সেনাবাহিনীর জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য তিন লাখ রিজার্ভ সৈন্য তলব করেছে রাশিয়া।

সমর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রিজার্ভ সৈন্য ডাকার অর্থ হচ্ছে যুদ্ধে রাশিয়ার অবস্থা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। সামরিক বিশ্লেষক মুরাত আসলান বলেন, একটি যুদ্ধে নিয়মিত সেনাবাহিনী সফল হলে রিজার্ভ সৈন্য তলব করার দরকার হয় না। রিজার্ভ সৈন্য তখনই ডাকা হয় যখন যুদ্ধ ক্ষেত্রে নিয়মিত সৈন্যদের ক্ষতি সাধন হয়। ইউক্রেনের বাহিনীর কাছে হেরে এর মধ্যেই রাশিয়াকে বেশ কিছু এলাকার দখল হারাতে হয়েছে। দখল করা এলাকাগুলোয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য রাশিয়াকে লড়াই করতে হচ্ছে।

সৈয়দ মাহমুদ আলী বলেন, রিজার্ভ সৈন্যদের কাছ থেকে যুদ্ধের সফলতা আশা করা হয়না। আমার ধারণা, ইউক্রেনে রাশিয়ার দখল করা এলাকাগুলো রক্ষায় তারা প্রতিরক্ষার বা দখল ধরে রাখতে ব্যবহার করা হবে। আর নিয়মিত যে বাহিনী রয়েছে, তাদের পাঠানো হবে যুদ্ধ করার জন্য বা ইউক্রেনের বাহিনীকে হটিয়ে দেয়ার জন্য। তিনি বলেন রিজার্ভ সৈন্যদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সরবরাহ এবং মোতায়েন করতে বেশ সময় লাগবে।

রাশিয়া কি আবার পুরাদস্তুর হামলা চালাবে?

ইউক্রেনে গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরুর সময় একে সীমিত সামরিক অভিযান বলে বর্ণনা করেছিল রাশিয়া। তখন তারা একে বিশেষ সামরিক অভিযান আখ্যা দিয়েছিল। কিন্তু এখন তারা বুঝতে পারছে সেটা আর সীমিত সামরিক অভিযানের মধ্যে নেই। কারণ যুদ্ধ শুরুর পর ইউক্রেনকে কোটি কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে ন্যাটো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন দিয়েছে তারা।

সেই সঙ্গে রাশিয়ার ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ফলে রাশিয়ার অর্থনীতির ওপর বেশ বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। রাশিয়ার সেনাদলও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। এর অর্থ রাশিয়া যেসব লক্ষ্য নিয়ে ইউক্রেনে সমরাভিযান শুরু করেছিল, তার অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র বা বিমান হামলা চালালেও রাশিয়া গত বছরের মতো আর ইউক্রেনে বড় ধরনের হামলা শুরু করবে বলে মনে করেন না ইস্তাম্বুলভিত্তিক সমর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মুরাত আসলান।

তিনি বলছেন, রাশিয়া এর মধ্যেই তাদের দখল করা এলাকা ধরে রাখা নিয়ে সংকটে রয়েছে। নতুন করে যুদ্ধ করতে গেলে তাদের বিশাল সৈন্য বাহিনী, সরঞ্জাম লাগবে। বরং তাদের কিছু কিছু এলাকা থেকে হটে যেতে হয়েছে, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ফলে তারা নতুন করে বড় ধরনের অভিযান চালানোর চেষ্টা করবে বলে আমার মনে হয় না। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেনে গত এক বছর ধরে রাশিয়া হামলা চালিয়ে গেলেও এখনো তারা নিজেদের পুরোপুরি ক্ষমতা ব্যবহার করেনি।

যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার আধুনিক অস্ত্রভাণ্ডারের ব্যবহার দেখা যায়নি। ইউক্রেনে রাশিয়া ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে, কিন্তু এরপরেও এখনো রাশিয়া ইউক্রেনে তার বিমানবহর, নৌবহর, ক্ষেপণাস্ত্রবহর বা আধুনিক সামরিক অস্ত্র পুরোপুরি ব্যবহার করেনি। রাশিয়া কখনোই ইউক্রেন যুদ্ধকে একটা সর্বাত্মক যুদ্ধ বলেনি। সেজন্য যে পরিমাণ সমর সামগ্রী, জনবল মোতায়েন করা দরকার, সেটাও তারা করেনি। বিমান ও নৌ হামলার ক্ষেত্রেও সীমিত শক্তি প্রয়োগ করেছে তারা।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, রুশ বাহিনীর মূল কিছু ইউনিট এবং যে বিশাল বিমানবহর, নৌবহর বা ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতা রয়েছে সেগুলো তারা ধরে রেখেছে যদি ন্যাটোর সঙ্গে তাদের কোনো রকম সংঘাত বাধে, তখন সেগুলো ব্যবহার করার জন্য। ন্যাটোর সঙ্গে রাশিয়া সরাসরি এখনো লড়াই করছে না কিন্তু ভবিষ্যতে যে করবে না তার নিশ্চয়তা নেই। তাই তারা সামরিক শক্তির সামান্য অংশ ব্যবহার করেছে ইউক্রেনের যুদ্ধে। বাকি অংশ তারা ধরে রেখেছে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলা করার জন্য। প্রয়োজন হলে রাশিয়া সেটা ব্যবহার করতে পারে। তার একটা ইঙ্গিত হয়তো পাওয়া যাচ্ছে।

এদিকে ইউক্রেন বহুবার বলেছে যে, তারা শান্তি আলোচনায় আগ্রহী তবে তার আগে দখল করা সব এলাকা রাশিয়াকে ছেড়ে দিতে হবে। তবে রাশিয়া হয়তো ইউক্রেনে দখল করা সব এলাকা ছাড়তে কখনো রাজি হবে না। বিশেষ করে দোনেৎস্ক, লুহানস্ক এবং ক্রিমিয়া তারা কখনোই ছাড়বে বলে মনে হয় না। কিন্তু ইউক্রেনীয় বাহিনীর পাল্টা হামলার মুখে পূর্বাঞ্চলে বেশ বিপদে পড়েছে রুশ বাহিনী।

এছাড়া নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ইউক্রেন ও রাশিয়া জুড়ে শীত থাকবে। তীব্র শীত ও বরফ জমে থাকার কারণে তাপমাত্রা ব্যাপক মাত্রায় কমে যায়। তখন কে কতটা যুদ্ধ করতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সেইসঙ্গে এই সময় পুরো ইউরোপে জ্বালানির একটা সংকট দেখা দেবে। ইউরোপের দেশগুলোতে একটা অর্থনৈতিক সংকটও দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রাশিয়া হয়তো চেষ্টা করবে এই সংকটের সুযোগ নিয়ে তার অবস্থান সুদৃঢ় করতে। বর্তমানে সেই উদ্দেশ্যেই রাশিয়া এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। রাশিয়া সম্প্রতি আইন করে দোনেৎস্ক এবং লুহানস্কসহ আরও দুটি এলাকাকে রুশ ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত করছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন ইতোমধ্যে বলেছেন যে, রাশিয়া দীর্ঘমেয়াদী লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত।

ইউক্রেনীয় বাহিনী এখন ন্যাটো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অনেক সামরিক সহায়তা পাচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, তারা অনেক গোয়েন্দা তথ্য পাচ্ছে। কোন এলাকায় আক্রমণ করলে রাশিয়ার সর্বাত্মক ক্ষতি হবে, সেই পরামর্শ তাদের দেওয়া হচ্ছে। সূত্র: বিবিসি বাংলা

পরিচয়/সোহেল

শেয়ার করুন