নিউইয়র্ক     বৃহস্পতিবার, ১৩ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ  | ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

কোন পথে যাচ্ছে রেমিট্যান্স

বাংলাদেশ ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২২ | ০৪:২১ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: ২০ নভেম্বর ২০২২ | ০৪:২১ পূর্বাহ্ণ

ফলো করুন-
কোন পথে যাচ্ছে রেমিট্যান্স

বাংলাদেশি শ্রমিকদের বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা আগের চেয়ে বেড়েছে বহুগুণ। করোনার স্থবিরতা কাটিয়ে বিদেশে শ্রমিক যাওয়ার মাত্রা বাড়ায় আপাত দৃষ্টিতে স্বস্তি ফিরেছে মনে হলেও আদৌতে তা হয়নি। কেননা তারা দেশে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাঠাচ্ছেন না বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ব্যাংকিংখাতে তাদের অনীহা থেকেই হয়তো তারা ভিন্নপথে দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন। এতে করে রেমিট্যান্সখাতে নেমেছে ধ্বস।

দেশের অর্ধেকের বেশি শ্রমিক যাচ্ছে সৌদি আরবে। নতুন করে শ্রমিক যাওয়ার দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ওমান। দেশ দুটি থেকে রেমিট্যান্স বেশি আসার কথা থাকলেও উল্টো কমেছে। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকেও বৈধ পথে প্রবাসী আয় কমছে। হুন্ডি তৎপরতা বেশি থাকায় মোট রেমিট্যান্সে এসব দেশের অংশ কমছে।

মূলত এশিয়া বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে থাকা শ্রমিকরা হুন্ডির আশ্রয় বেশি নিচ্ছেন। অবশ্য এ সময়েও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য থেকে প্রবাসী আয় বাড়ছে। এসব দেশে তুলনামূলক দক্ষ ও সচেতন কর্মীরা যান।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বৈধ পথে এ পর্যন্ত দেশের বাইরে গেছেন এক কোটি ৪৫ লাখ কর্মী। এর মধ্যে সৌদি আরবে গেছেন প্রায় ৩৬ শতাংশ। আর চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট লাখ ৭৫ হাজার কর্মী বাইরে গেছেন। এর মধ্যে ৫ লাখ ১৪ হাজার বা ৫৯ শতাংশই গেছেন সৌদি আরবে। গত বছর ছয় লাখ ১৭ হাজার শ্রমিক যান সে দেশে। ২০২০ সালে এ সংখ্যা ছিল দুই লাখ ১৮ হাজার। শ্রমিক যাওয়া বাড়লেও দেশটি থেকে মোট রেমিট্যান্সে অংশ কমছে।

করোনার বছর ২০২০ সালে মোট দুই হাজার ১৭৫ কোটি ডলার রেমিট্যান্সের ২৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ আসে সৌদি আরব থেকে। পরের বছর সেখান থেকে মোট রেমিট্যান্সের ২৩ দশমিক ১৭ শতাংশ আসে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ অংশ আরো কমে ১৯ শতাংশের নিচে নেমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা ও কয়েকজন ব্যাংকারের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বল্পশিক্ষিত, অদক্ষ এবং স্বল্পদক্ষ শ্রমিক যান। তাদের অনেকের মধ্যে ব্যাংকিংভীতি থাকে। শ্রমিকদের ছুটির দিনে সাধারণত ব্যাংক বা এক্সচেঞ্জ হাউস বন্ধ থাকে। শ্রমজীবী হওয়ায় চাইলেও কাজ ফেলে তারা আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে অর্থ পাঠানো তাদের জন্য অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যাংকের তুলনায় বেশি টাকার প্রলোভনসহ নানা উপায়ে হুন্ডি কারবারিরা তাদের থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। এরপর বাংলাদেশি এজেন্টের মাধ্যমে প্রবাসীর কাছে দ্রুততম সময়ে টাকা পৌঁছে দেয়। বর্তমানে হুন্ডি কারবারিরা মোবাইল ব্যাংকিং বা এমএফএস মাধ্যমেরও অপব্যবহার করছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের বেশিরভাগই এখন ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ না পাঠিয়ে হুন্ডির আশ্রয় নিচ্ছেন। জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধির সাথে রেমিট্যান্সের মিল না থাকার যা বড় কারণ। হুন্ডি ঠেকানোর সহজ কোনো উপায় নেই। সাধারণভাবে ব্যাংকের ঋণখেলাপি ব্যবসায়ী, দুর্নীতিবাজ আমলা ও রাজনীতিকরা অর্থ পাচার করেন। যতদিন পাচারের চাহিদা থাকবে, হুন্ডি ততদিন চলবে। অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে অন্য যা কিছুই করা হোক, বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়বে না।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কর্মী যাচ্ছে ওমানে। চলতি বছর মোট শ্রমিকের ১৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ গেছে দেশটিতে। আগের বছর প্রায় ৯ শতাংশ এবং ২০২০ সালে ছিল ১০ শতাংশের মতো। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের ১২ শতাংশের মতো থাকেন ওমানে। অথচ মোট রেমিট্যান্সে ধারাবাহিকভাবে অংশ কমে তিন দশমিক ৫৬ শতাংশে নেমেছে। করোনার মধ্যে ২০২০ সালে যেখানে মোট রেমিট্যান্সের প্রায় সাত শতাংশ এসেছিল সে দেশ থেকে। গত বছর এসেছিল ৫ শতাংশের মতো।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কমলেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাড়ে সাত শতাংশ থাকেন মালয়েশিয়ায়। অথচ সে দেশ থেকে ধারাবাহিকভাবে রেমিট্যান্সের অংশ কমে পাঁচ শতাংশে নেমেছে। ২০২০ সালে মোট রেমিট্যান্সের আট শতাংশ এসেছিল দেশটি থেকে। গত বছর এসেছিল ছয় দশমিক ১২ শতাংশ।

চলতি বছর মোট শ্রমিকের সাড়ে পাঁচ শতাংশ গেছে সিঙ্গাপুরে। সব মিলিয়ে মোট প্রবাসীর ছয় শতাংশ থাকেন সিঙ্গাপুরে। অথচ রেমিট্যান্স আহরণে শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় নেই সিঙ্গাপুর। অথচ চলতি বছরের ৯ মাসে মাত্র ২৭ কোটি ডলার এসেছে সে দেশ থেকে। গত বছর এসেছিল ৩৮ কোটি ডলার। আগের বছর যা ছিল ৫৭ কোটি ডলার। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে করোনার বছর মোট রেমিট্যান্সের ১১ দশমিক ৫৩ শতাংশ এসেছিল। অথচ গত বছর তা কমে আট দশমিক ৩৯ শতাংশে নামে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সামান্য বেড়ে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ হয়েছে।

রেমিট্যান্স আহরণের দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্র থেকে চলতি বছরের ৯ মাসে ২৭৫ কোটি ডলার বা প্রায় ১৭ শতাংশ রেমিট্যান্স এসেছে। আগের বছর যা ১৬ শতাংশ ছিল। আর করোনার মধ্যে এসেছিল ১৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ। চতুর্থ অবস্থানে থাকা যুক্তরাজ্য থেকে ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ রেমিট্যান্স এসেছে। গত বছর ছিল আট দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং তার আগের বছর ছিল সাত দশমিক ৫৮ শতাংশ। মূলত এসব দেশ থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বেশি।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি এখন চাঙ্গা। এসব দেশ থেকে রেমিট্যান্স কমার মূল কারণ হুন্ডি। আর যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশে মন্দাভাব চলছে। এর মধ্যেও এসব দেশ থেকে প্রবাসী আয় বৃদ্ধির মূল কারণ সেখান থেকে ব্যাংকের বাইরে অর্থ পাঠানোর সুযোগ কম।

তিনি বলেন, সামনে নির্বাচন এবং অর্থনীতিতে এক ধরনের সংকট চলছে। অন্যদিকে খোলাবাজারের সাথে ব্যাংকের ডলারের দরে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এ রকম পরিস্থিতিতে হুন্ডি কমানো খুব কঠিন। আবার এখন একটি শ্রেণি তৈরি হয়েছে, যারা হয়তো ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার জন্য বাইরে পাঠিয়েছিলেন। তারা আর দেশে না আসায় বাবা, মা বা আত্মীয়স্বজনও সেখানে চলে যাচ্ছেন। যাওয়ার সময় জমানো সঞ্চয় ও সম্পদ বিক্রি করে নিয়ে যাচ্ছেন। ফলে হুন্ডি একেবারে বন্ধ হবে না। তবে কমানো সম্ভব। কমানোর জন্য প্রবাসীদের ভালোভাবে বোঝাতে হবে, ব্যাংকের বাইরে অর্থ পাঠালে দেশের লোকসান হয়। ব্যাংকগুলোরও তৎপরতা বাড়াতে হবে।

করোনাভাইরাসের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত। তখন সরকারি বিধিনিষেধ, আতঙ্কের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। অনেকে কাজে যোগ না দিতে পেরে ঘরবন্দি ছিলেন। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড ২৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স আসে ২০২০-২১ অর্থবছরে। আগের অর্থবছরের তুলনায় যা ৩৬ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি ছিল।

করোনার ধাক্কা কাটিয়ে গত অর্থবছর বিশ্ব অর্থনীতি ব্যাপক গতিশীল ছিল। অথচ দেশের রেমিট্যান্স ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ কমে ২১ বিলিয়নিয়ার। বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে টাকার বিপরীতে ডলারের ব্যাপক বেড়ে যাওয়ার পর চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রেমিট্যান্স কিছুটা বেড়েছিল। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে কমে গেছে।

ব্যাংকাররা জানান, দেশ থেকে প্রতিবছর প্রচুর অর্থ পাচারের বিষয়টি সবারই জানা। সম্প্রতি গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার অভ্যন্তরীণ বৈঠক ও বিভিন্ন সভা-সেমিনারে হুন্ডি, আন্ডার ইনভয়েসিং এবং ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারের কথা বলছেন। হুন্ডি চক্রে জড়িত সন্দেহে বিএফআইইউর নির্দেশনার আলোকে বিভিন্ন এমএফএস কোম্পানি প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার এজেন্টশিপ বাতিল করেছে। গত বুধবার (১৫ নভেম্বর) প্রথমবারের মতো ২৩০টি এমএফএস হিসাব ফ্রিজ করে বিএফআইইউ। সূত্র : সাম্প্রতিক দেশকাল

শেয়ার করুন