বৃহস্পতিবার ২৬ মে ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
পরিচয়
আন্তর্জাতিক বাকি বিশ্ব বিশ্ব

ইউক্রেনকে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা কেন ব্যর্থ হচ্ছে?

ইউক্রেনকে ঘিরে রাশিয়া ও ন্যাটোর সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এরমধ্যেই চলছে যুদ্ধাবস্থা এড়াতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে আলোচনার জন্য কিয়েভ সফরে গেছেন। এই সফরের আগে ৭ ফেব্রুয়ারি মস্কোতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন তিনি।

৭ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্টের দফতর হোয়াইট হাউজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎস। ইউক্রেনের নেতার সঙ্গে বৈঠকের জন্য ১৪ ফেব্রুয়ারি সোমবার কিয়েভ সফরে গেছেন তিনি।

এই ধরনের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা সম্ভবত আগামী দিনে আরও জোরালো হবে। অনেক পর্যবেক্ষক মস্কোর সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের জন্য ২০ ফেব্রুয়ারিকে একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচনা করছেন। এদিন বেলারুশের সঙ্গে রাশিয়ার যৌথ সামরিক মহড়ার শেষ দিন। আবার বেইজিংয়ে শীতকালীন অলিম্পিকেরও শেষ দিন। একই সঙ্গে দিনটি ২০১৪ সালে মস্কোর ক্রিমিয়া আক্রমণের বার্ষিকী।

আন্তর্জাতিকভাবে মধ্যস্থতার নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও ক্রিমিয়ার ঘটনার পরও ইউক্রেনের সংঘাত প্রায় আট বছর ধরে অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি কেন ধরাছোঁয়ার এতোটা বাইরে? যাবতীয় মধ্যস্থতাও কী ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে? হতাশা ছাড়া সামনে এগিয়ে যাওয়ার কোনও বার্তা কী অবশিষ্ট নেই?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য ফিরতে হবে সংকটের একেবারে গোড়ার দিকে। ফিরে তাকাতে হবে ২০১৩ সালের শেষ দিকে। এর পরের বছরই ক্রিমিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেয় রাশিয়া। পূর্ব ইউক্রেনে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীদের সমর্থন দেয় তারা।

সংকটের শুরু যেভাবে

২০১৩ সালের নভেম্বরে ইউক্রেনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে বিশাল বাণিজ্য চুক্তি করতে চাইলেন, যা প্রকারান্তরে ইইউ-এর সদস্যপদ লাভের পথে কয়েক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। তখন পুতিন ইউক্রেনের ওপর চাপ বাড়াতে শুরু করেন। এরপর যখন ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ ইইউ-এর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা থেকে বেরিয়ে এলেন, তখন তার বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ শুরু হয়। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার পতনের পর ক্ষমতায় আসা পশ্চিমাপন্থীরা এমন কিছু পদক্ষেপ নেয় যা পুতিনকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। ইউক্রেনের রুশপন্থী বিদ্রোহীদের সমর্থনে এগিয়ে আসে মস্কো। এক পর্যায়ে ক্রিমিয়া দখল করে অঞ্চলটিকে রাশিয়ার অংশ বলে ঘোষণা করে ক্রেমলিন।

ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ সরকারের পতনের দাবিতে ইউক্রেনের গণবিক্ষোভ নিয়ে শুরু থেকেই রাশিয়া এবং পশ্চিমা দুনিয়ার ভিন্ন ব্যাখ্যা ছিল। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউরোমেইডান নামে পরিচিত পাওয়া এই বিক্ষোভকে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত এবং স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রকামী মানুষের বিজয় হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে রাশিয়া এটিকে একটি অবৈধ অভ্যুত্থান হিসেবে দেখে।

মস্কো মনে করে পশ্চিমা দুনিয়া, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব ইউরোপে প্রভাব বিস্তারের জন্য এই বিক্ষোভে সমর্থন দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে, পূর্ব ইউক্রেনে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উত্থানকে ইউক্রেনের সংঘাতে রাশিয়ার প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ হিসেবে বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ। অন্যদিকে মস্কো বিষয়টিকে এভাবে চিত্রিত করে যে, পূর্ব ইউক্রেনের স্থানীয় বাসিন্দারা কিয়েভকে প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইউক্রেনীয় সংঘাতের উৎপত্তি নিয়ে রাশিয়া ও পশ্চিমাদের এই ভিন্ন ব্যাখ্যা শুরু থেকেই সংঘাত সমাধানের মধ্যস্থতা প্রক্রিয়াকে মেঘাচ্ছন্ন করে দিয়েছে।

মধ্যস্ততার যত উদ্যোগ

ডনবাস অঞ্চলে কয়েক মাস যুদ্ধের পর ২০১৪ সালে তিনটি পক্ষকে নিয়ে ইউক্রেন ইস্যুতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে একটি প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই তিনটি পক্ষ হলো ইউক্রেন, রাশিয়া এবং ইউরোপের নিরাপত্তা ও সহযোগিতা সংস্থা (ওএসসিই)। ত্রিপক্ষীয় এই যোগাযোগ গ্রুপের সমান্তরালে একই মাসে নরম্যান্ডি ফোর নামের আরেকটি গ্রুপ তৈরি করা হয়। এতে ইউক্রেন ও রাশিয়াকে মূল পক্ষ এবং জার্মানি ও ফ্রান্সকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্ত করা হয়।

ত্রিপক্ষীয় কন্টাক্ট গ্রুপটি প্রাথমিকভাবে কৌশলগত এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলোর ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। আর নরম্যান্ডি ফোর আলোচনা আরও কৌশলগতভাবে এগোনোর দিকে দৃষ্টিপাত করে। একইসঙ্গে সংঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত বৃহত্তর রাজনৈতিক সমস্যাগুলো মোকাবিলাও এর উদ্দেশ্য ছিল।

ত্রিপক্ষীয় যোগাযোগ গোষ্ঠী এবং নরম্যান্ডি ফোর উভয়ের জন্য মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে জটিল বিষয়টি ছিল ইউক্রেন সংঘাতে রাশিয়ার ভূমিকাকে ঘিরে। ক্রিমিয়ার মতো পূর্ব ইউক্রেনে রাশিয়া আনুষ্ঠানিক সামরিক হস্তক্ষেপ করেনি। এর বদলে তারা গোপনে রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্র সরবরাহ করে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী বাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্য হাজার হাজার অচিহ্নিত সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করে।

রাশিয়ার মতে, ইউক্রেনের সংঘাত ছিল ইউক্রেনীয় সরকার এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মধ্যে একটি গৃহযুদ্ধ। মস্কোর পক্ষ থেকে আলোচনার টেবিলে ডোনেস্ক পিপলস রিপাবলিক এবং লুহানস্ক পিপলস রিপাবলিক (ডনবাসে রাশিয়া-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী)-এর প্রতিনিধিদের সরাসরি অংশগ্রহণের দাবি তোলা হয়। আর কিয়েভের অবস্থান ছিল, সংঘাতের দুইটি পক্ষ হচ্ছে ইউক্রেন ও রাশিয়া। আর ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা রাশিয়ান প্রক্সি হিসেবে কাজ করে।

ইউক্রেনের অবস্থান ছিল, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে তারা সরাসরি কোনও আলোচনায় বসবে না। কেননা, এ ধরনের আলোচনায় অংশগ্রহণ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের রাজনৈতিক বৈধতার স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হবে। দেশটির এমন বক্তব্য বিবেচনায় নিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ত্রিপক্ষীয় যোগাযোগ গ্রুপ এবং নরম্যান্ডি ফোর আলোচনা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ফলশ্রুতিতে রাশিয়াকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে দেখা হয়। যদি মস্কো আনুষ্ঠানিকভাবে তার এই ভূমিকার কথা স্বীকার করেনি।

এই অস্পষ্টতা সত্ত্বেও পূর্ব ইউক্রেনে রুশপন্থীদের বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর যুদ্ধ অবসানে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে বেলারুশের রাজধানী মিনস্কে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মিনস্ক প্রটোকল নামে পরিচিত ওই চুক্তি ছিল আদতে একটি উচ্চাভিলাষী শান্তি চুক্তি। ১২ দফার ওই চুক্তিতে যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি জিম্মিদের মুক্তি, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক বিষয়াদিও যুক্ত করা হয়। এছাড়া এতে ইউক্রেনের বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোতে স্বশাসন বা একটি বিশেষ মর্যাদা প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার নেপথ্যে

মিনস্ক প্রটোকল নামের এই চুক্তি বা সমঝোতা অবশ্য প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ভেঙে যায়। কোনও পক্ষই যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার প্রথম পয়েন্টটি মেনে চলেনি। পরের বছরের গোড়ার দিকে বিরোধের অবসানের জন্য একটি নতুন মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এবার ওএসসিই-এর সঙ্গে ফ্রান্স ও জার্মানিকেও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মিনস্ক প্রক্রিয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতে আলোচনার জন্য কিছু সুযোগ তৈরি করলেও শেষ পর্যন্ত সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি। এ দফায়ও স্বাক্ষর করার পরপরই যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যায়। দ্বিতীয় মিনস্ক চুক্তির ব্যর্থতা এখন পর্যন্ত ইউক্রেনে একটি রাজনৈতিক সমাধানের তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে রয়ে গেছে।

স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত অঞ্চলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিশেষ করে ন্যাটোর সম্প্রসারণে ক্রেমলিন কখনও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেনি। পুতিন ইউক্রেনের ইউরোমাইদান বিপ্লবকে এ ধরনের সম্প্রসারণের অগ্রসর ধাপ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিমা দুনিয়া এবং ন্যাটোর সঙ্গে ইউক্রেনের সম্পর্ক বেড়েছে। ফলে পুতিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, নষ্ট করার মতো সময় আর হাতে নেই। তিনি ইউরোপের নিরাপত্তার বাস্তবতাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করছেন। এখানে ইউক্রেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফ্যাক্টর। তবে ইউক্রেন আক্রমণই রাশিয়ার সামরিক তৎপরতার একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। তারা বরং সোভিয়েত পরবর্তী রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা দুনিয়ার সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস করতে আগ্রহী পুতিন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে বৈঠকের পর পুতিন অবশ্য নিজেও বিষয়টি কার্যত স্বীকার করে নিয়েছেন।

পুতিন স্বীকার করেছেন, রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্পষ্টতই ইউক্রেনকে ঘিরে নয় বরং ন্যাটো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সহাবস্থানের রীতিগুলো স্পষ্ট করতে চায় মস্কো।

উভয় পক্ষকে এটি স্বীকার করতে হবে যে, এই ধরনের আলোচনার পরিসর শুধু ইউক্রেন ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নেই। রাশিয়া ও পশ্চিমা দুনিয়ার সামগ্রিক সম্পর্কের বিষয়টি এর সঙ্গে জড়িত। এটি স্বীকার করা ছাড়া ইউক্রেন ইস্যুতে আলোচনায় বাস্তব অগ্রগতি অর্জন করা কঠিন হবে। ফরেন পলিসি অবলম্বনে।

সোস্যাল শেয়ার :

Related posts

মন্তব্য করুন

Share
Share